আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ

গুম মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর, কেউ ফেরে কেউ ফেরে না
অনলাইন ডেস্ক: আজ ৩০ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’। ‘গুম’ শব্দটি ভয়ঙ্কর আতঙ্কের নাম। যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। গুমের শিকার ব্যক্তিদের কেউ ফিরে আসতে পারে, কেউ কোনদিনই ফিরে না। গুম হয়ে যাওয়া মানুষের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের দিন কাটে এক অনিশ্চিত বাস্তবতায়, যেখানে কোনো সমাপ্তি নেই। কেউ মারা গেলে পরিবারের সদস্যরা শোক প্রকাশ করতে পারেন, দাফন-কাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন, কবর জিয়ারত করতে পারেন। কিন্তু কেউ গুমের শিকার হয়ে আর না ফিরলে সেক্ষেত্রে স্বজনদের শোক পালনের সুযোগটুকুও থাকে না। কী নির্মম!
‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’- এই প্রতিপাদ্যে এবার পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সাত শতাধিক মানুষকে গুমের অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে ‘সৌভাগ্যবান’ কেউ কেউ পরিবারের কাছে ফিরেছেন। কিন্তু, বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ অনেকে এখনও ‘নিখোঁজ’। নিখোঁজদের স্বজনরা এখনও অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকেন, ডুকরে কাঁদেন। সন্তানহারা মা, নিখোঁজ বাবার সন্তান, তুলে নিয়ে গেছে এমন ভাইয়ের বোন, গুম হওয়া স্বামীর স্ত্রীসহ পরিবারের জিজ্ঞাসা- স্বজনেরা কোথায়? বেঁচে আছেন নাকি মেরে ফেলা হয়েছে? মেরে ফেলা হলে মরদেহ কোথায় সমাহিত করা হয়েছে? তাদের অনেকেরই এই প্রশ্নের জবাব হয়তো আর কোনদিনই মিলবে না।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তির স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করছে। জোরপূর্বক গুম একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে এধরনের অপকৌশল ব্যবহার করে থাকে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবার তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতে পারে না এবং বিচার পাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, স্মরণ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানাতে ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়ে আসছে।
দিবসটির ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম বন্ধের পাশাপাশি এই অপরাধের জন্য দায়মুক্তি বন্ধ করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তার লক্ষ্যে ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম হওয়া সব ব্যক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সনদ হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়্যারেন্স’ সম্মেলনে যে আন্তর্জাতিক সনদ কার্যকর হয়, সেই সনদে ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন, সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা দিবসটি পালন করে।
দিবসটির মূল উদ্দেশ্য ছিল গুম নামক মানবতাবিরোধী অপরাধকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা এবং রাষ্ট্রগুলোর ওপর জবাবদিহিতার চাপ সৃষ্টি করা। ২০১১ সাল থেকেই বাংলাদেশে দিনটি পালিত হতে থাকে। বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়, কিন্তু তা তীব্রভাবে আলোচিত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে গুম করে ‘আয়নাঘরে’ আটক রেখে নির্মমতার চিত্র গুম কমিশন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে গা শিউরে উঠে।
বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, এমনকি সাংবাদিকদের গুমের ঘটনার চিত্র উঠে আসে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু পরে আর খোঁজ মেলেনি।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক আবেদন দাখিল করেছেন গুমের শিকার ও ভুক্তভোগী পরিবার। কয়েকটির বিচারও শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট সই করেছে বাংলাদেশ।
গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার শুরু করেছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে শনিবার (২৯ আগস্ট) দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গুম মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বর্তমান সরকার গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ হচ্ছে গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স। বাংলাদেশের পতিত, পরাজিত ও পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমন করার জন্য গুম-অপহরণের অমানবিক পথ বেছে নিয়েছিল। গুম-অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর ধরে আটক রাখার জন্য তৈরি করেছিল গোপন বন্দিশালা। পলাতক ফ্যাসিস্ট আমলের এসব গোপন বন্দিখানা জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল।
দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার বিভিন্ন সময়ে কমপক্ষে ৭ শতাধিক মানুষকে গুম করেছে। এটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক। বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে ‘গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ বন্ধ করতে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়ন করছে। ইতোমধ্যেই জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপিত হয়েছে। একইসঙ্গে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’-ও জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। সরকার আশা করে, উত্থাপিত বিলগুলো যথানিয়মে আইনে পরিণত হলে ভবিষ্যতে আর কেউ গুম কিংবা অপহরণের মতো মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের পথ বেছে নেবে না।
গুমের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সংসদে বিল
গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যাক্তির শাস্তি নিশ্চিতকরণ, ভুক্তভোগী ও তাদের অধিকার সংরক্ষণ, প্রতিকার প্রদান এবং মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপিত হয়েছে।
বিলটি উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরীক্ষা করে দুই কার্যদিবসের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দিতে বিলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। আজ রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিলটি নিয়ে আলোচনা হবে। দুই-একদিনের মধ্যেই সংসদীয় কমিটি সংসদে প্রতিবেদন দেবে। এরপর সংসদের চলতি তৃতীয় অধিবেশনেই বিলটি পাস হবে।
গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর গুমের কারণে মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে বা পাঁচ বছর পরও ব্যক্তির সন্ধান না মিললে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে।
গুম কমিশনের প্রতিবেদনে ভয়াবহ চিত্র
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গুম সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করলে বিষয়টি আরও জোরালোভাবে সামনে আসে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, তারা ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ পেয়েছে এবং যাচাইয়ের পর তাদের তথ্যমতে, ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে এমন মামলা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়।
কমিশনের সদস্যদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে এবং ধারণা করা হচ্ছে- ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার কখনোই কমিশনের কাছে আসেনি। কমিশন জোরপূর্বক গুমকে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং বলেছে, তাদের তদন্তে তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্পৃক্ততা প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কমিশন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে- বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিন আহমদ (বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ও হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা আবদুল্লাহিল আমান আজমি, ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের ঘটনা।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো ২০০৯ সাল থেকে ৭০৮টি কথিত জোরপূর্বক গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, আর র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন ২ শতাধিক কথিত গুমের ঘটনায় জড়িত ছিল। ঘটনাগুলোর মধ্যে যে ঘটনাটি এই প্রবণতার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, তার একটি হলো বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়া। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গাড়িচালকসহ তিনি নিখোঁজ হন। তার অবস্থান সম্পর্কে এখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমের নিখোঁজ হওয়া। ২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকায় তাকে সাদা পোশাকধারী নিরাপত্তা সদস্যরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তার কোনো সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। এবছরের জুনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এক সাক্ষী বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাবেক র্যাব কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের ভূমিকা নিয়ে সাক্ষ্য দেন।
গুমের অন্যতম প্রতীক ছিল ‘আয়নাঘর’, যেখানে ভুক্তভোগীদের স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে আটকে রাখা হতো। জোরপূর্বক গুম বিষয়ে তদন্ত কমিশন বলেছে, তাদের তদন্তে গোপন আটককেন্দ্র এবং এমন একটি ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেখানে অভিযানগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে লিখিতভাবে পরিচালিত হতো, ফলে দায় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়তো।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কমিশনের প্রথম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬৭৬টি অভিযোগ পেয়েছে এবং অনুমান করেছে যে, জোরপূর্বক গুমের সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার গুমের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং এসব ঘটনা গোপন রাখার লক্ষ্যে একটি ‘সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা’র কথা বলা হয়।
পরবর্তী সময়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বলেছিল, সারা দেশে এধরনের শত শত গোপন আটককেন্দ্র ছিল, আর অনেক ভুক্তভোগী মাস বা বছর ধরে বন্দি থাকার পর ফিরে এসেছেন এবং অন্যরা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবিত ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ছিলেন জামায়াত-শিবিরের নেতা বা কর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও এর সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কমিশনের মতে, যারা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
আওয়ামী লীগের পুরো মেয়াদজুড়েই নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের বিষয়ে তথ্যের দাবিতে বারবার বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করেছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলোর গঠিত প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’ অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়।
‘গুম মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ’
‘বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি:একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সিম্পোজিয়ামে গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, গুম মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। গুমের শিকার হলে পরিবার জানতেই পারে না সে কোথায় আছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার দীর্ঘসময় অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে। আশা ও হতাশার মাঝামাঝি এক স্থগিত অবস্থায় তারা সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক সংকট ও একঘরে হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
‘আয়নাঘর’ দুঃসহ স্মৃতি
ধরেই বেঁধে ফেলা হতো হাত ও চোখ। মুখমণ্ডল ঢেকে দিতে পরানো হতো টুপি। নিয়ে যাওয়া হতো গোপন বন্দিশালায়। জানালাবিহীন ছোট্ট কক্ষটিতে সার্বক্ষণিক উচ্চ আলোর বাতি জ্বলে। রাতদিন বোঝার উপায় নেই। কখনো কখনো বাতি বন্ধ করে দিত, তখন নেমে আসত ঘুটঘুটে অন্ধকার। এগজস্ট ফ্যানের বিকট শব্দের কারণে শোনা যেত না বাইরের কোনো শব্দ।
জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে ও পরে গোপন বন্দিশালা থেকে ছাড়া পাওয়া ব্যক্তিদের কয়েকজন বন্দিশালার এমন চিত্র তুলে ধরেছেন। তারা বলেছেন, ওই অজ্ঞাত বন্দিশালায় বেঁচে থাকাটাও ছিল দুঃসহ যন্ত্রণার। সারাক্ষণ মৃত্যুর প্রহর গুনতে হতো, এই বুঝি বের করে নিয়ে গেল। ‘আয়নাঘর’-এর দুঃসহ স্মৃতি মনে পড়লে তারা এখনও ভয়ে আঁতকে ওঠেন।
একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তুলে নেওয়ার পরপর ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন করা হতো। কাউকে কাউকে মাঝেমধ্যে নিয়ে যেত নির্যাতনকক্ষে (টর্চার সেল)। চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরা অবস্থায় শৌচাগারে আনা- নেওয়ার পথে নির্যাতনের শিকার অন্যদের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেত।
২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় দেখা গেছে, তুলে নেওয়া ব্যক্তিদের মুখমণ্ডলে পলিথিন পেঁচিয়ে রেখে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর পেট কেটে মৃতদেহের সঙ্গে সিমেন্ট বা ভারী বস্তু বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। আবার কাউকে কাউকে লম্বা সময় পরে কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
আয়নাঘর নামের ব্যাখ্যায় দুই দফা গুমের শিকার সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান বলেন, প্রহরীরা মাঝেমধ্যে অবজ্ঞা করে বলত, আয়নাঘরের মধ্যে আছেন। আয়নাঘর একটি রূপক নাম। যেখানে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দেখা যায় না।
শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পরদিন ৬ আগস্ট গোপন বন্দিশালা থেকে ছাড়া পান দীর্ঘদিন গুম থাকা তিনজন। তারা হলেন- সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, আইনজীবী আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) নেতা মাইকেল চাকমা। প্রথম দুজন প্রায় আট বছর এবং শেষের জন পাঁচ বছরের বেশি সময় গোপন বন্দিশালায় ছিলেন। সৌজন্যে: দৈনিক ইত্তেফাক




