ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

এআই ক্যামেরায় ফিরছে শৃঙ্খলা

অনলাইন ডেস্ক: দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরা চালুর পরপরই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উদ্বোধনের প্রথম দিন ১৮ আগস্ট মহাসড়কে অতিরিক্ত গতি ও উলটো পথে গাড়ি চালানোর দায়ে ৪৪৬টি মামলা হলেও পরদিন ১৯ আগস্ট তা নেমে এসেছে মাত্র ৪২টিতে। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানেই মামলা কমেছে প্রায় ৯১ শতাংশ।

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, এআই ক্যামেরা চালুর প্রথম দিন অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর দায়ে ৪১৭টি মামলা হয়। এর মধ্যে কুমিল্লা অঞ্চলে ৩৯৭টি এবং গাজীপুর অঞ্চলে ২০টি মামলা করা হয়। একই দিনে উলটো পথে গাড়ি চালানোর দায়ে ২৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুর অঞ্চলে ২৩টি এবং কুমিল্লা অঞ্চলে ছয়টি ঘটনা শনাক্ত হয়।

তবে পরদিন ১৯ আগস্ট চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঐ দিন গাজীপুর ও কুমিল্লা অঞ্চলে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর দায়ে মামলা হয়েছে মাত্র ৪২টি। উলটো পথে গাড়ি চালানোর কোনো ঘটনাই শনাক্ত হয়নি। ফলে এআই ক্যামেরার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর চালকদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা।

সারা দেশে মোট আটটি অঞ্চলের মাধ্যমে মহাসড়কের নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দেখভাল করে হাইওয়ে পুলিশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে স্থাপিত এআই প্রযুক্তির ক্যামেরাগুলো গাজীপুর ও কুমিল্লা অঞ্চলের আওতাধীন। মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ জেলার অংশ পর্যন্ত গাজীপুর অঞ্চলের মধ্যে এবং দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত অংশ কুমিল্লা অঞ্চলের আওতায় রয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশ বলছে, এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপনের ফলে চালকদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হচ্ছে এবং এর ফলে দুর্ঘটনা কতটা কমছে, তা নির্দিষ্ট সময় পরপর মূল্যায়ন করা হবে।

এ ব্যাপারে হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশনস) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘আইন মেনে চলার প্রবণতা ও দুর্ঘটনা কমছে কি না, তা নির্দিষ্ট সময় পরপর মূল্যায়ন করা হবে। এরই মধ্যে মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। এআই ক্যামেরার উদ্যোগটি সফল হবে বলে আশা করি।’ তিনি বলেন, ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ শনাক্ত করে মামলা হওয়ায় এতে মানুষের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। মামলা অটোমেটিক হচ্ছে, অটোমেটিক মোবাইলে মেসেজ চলে যাচ্ছে। আপনাকে সেটা পে করতে হচ্ছে। মামলা এড়ানোর কোনো রাস্তা থাকবে না।’

হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মহাসড়কে ১ হাজার ৪২৭টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মহাসড়কের উভয় পাশে ৪৯০টি খুঁটিতে এসব ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ক্যামেরাগুলো একটি ডেটা সেন্টার ও পাঁচটি মনিটরিং সেন্টারের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পুরো প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৪২ কোটি টাকার কিছু বেশি। এআই ক্যামেরার মাধ্যমে মহাসড়কে নির্ধারিত গতিসীমার বেশি গতিতে গাড়ি চালানো, উলটো পথে চলাচল, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, থ্রি-হুইলার চলাচল, ট্রাফিক সাইন ও সিগন্যাল অমান্য করা এবং অবৈধ পার্কিংসহ বিভিন্ন ধরনের আইন লঙ্ঘনের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও রেকর্ড করা হচ্ছে।

২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, মহাসড়কে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি চালানোর সুযোগ নেই। উলটো পথে গাড়ি চালালে ৩ হাজার টাকা এবং অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে ২ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

চালকদের মধ্যেও সতর্কতা : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলকারী বাসের যাত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, বেপরোয়া গতির কারণে তাদের এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত। এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর বুধবার গাড়ির বেপরোয়া গতি কিছুটা কমেছে বলে তার মনে হয়েছে। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোটরসাইকেল চালক আব্দুল করিম। তিনি বলেন, ‘এআই ক্যামেরা চালুর কারণে সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছি, যাতে মামলায় না পড়ি।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস এম আহম্মেদ খোকন বলেন, এআই ক্যামেরার ব্যবহারে ভালো সুফল মিলবে বলে তারা আশা করছেন। মহাসড়কে যানবাহন চলাচলের সময় নির্ধারিত গতিসীমা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে মালিক ও চালকদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি না চালানোর নির্দেশনা দিয়ে ইতিমধ্যে সব গাড়িতে সমিতির পক্ষ থেকে সার্কুলার জারি করা হয়েছে।’

এ এস এম আহম্মেদ খোকন আরও বলেন, মামলা ও জরিমানা এড়াতে চালকেরা এখন থেকে আরও বেশি সতর্ক হবেন। পাশাপাশি গাড়ির ফিটনেস বা লাইসেন্স নবায়নের সময় ক্যামেরায় ধারণ করা চিত্র দেখে চালকদের অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়াও সহজ হবে। এতে চালকদের মধ্যে আরও সতর্কতা তৈরি হবে এবং ধীরে ধীরে সড়কে আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা কমে আসবে।

Related Articles

Back to top button