প্রকৃতির ডাকে ঝোপখালীতে অতিথি পাখির উৎসব

অনলাইন ডেস্ক: রূপ বদলায় বরগুনার বেতাগী উপজেলার ঝোপখালী। বর্ষায় থমথমে থাকা জলাভূমি শীত এলেই হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। নিস্তব্ধ খাল-বিলের বুকে নেমে আসে হাজার মাইল পথ পাড়ি দেওয়া দূরদেশের অতিথি পাখি।

সাইবেরিয়া, মধ্য এশিয়া ও হিমালয় অঞ্চলের হিমশীতল আবহ বুকে নিয়ে প্রতি বছর শীত মৌসুমে ঝোপখালী হয়ে ওঠে পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এই জলাভূমিতে এখন দেখা মিলছে হাঁস, পানকৌড়ি, বালিহাঁস, চখাচখি, ডাহুকসহ নানা প্রজাতির পাখির।

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ডানার ঝাপটানি আর কিচিরমিচির কলরবে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। মনে হয়, প্রকৃতি নিজেই যেন এখানে প্রাণের উৎসব সাজিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা বলেন, “বরগুনা জেলা কিংবা দক্ষিণাঞ্চলের অন্য কোথাও এমন দৃশ্য চোখে পড়ে না। শীত এলেই শুধু ঝোপখালীতেই বিদেশি নানা প্রজাতির পাখির সমাগম ঘটে। বছরের এই সময়টায় জলাভূমির রূপ একেবারে বদলে যায়। সকালে ঘুম ভাঙে পাখির ডাক শুনে—এ দৃশ্য আমাদের জন্য গর্বের।”

দূর থেকে ঝোপখালী দেখতে আসা দর্শনার্থী আফজাল হোসেন বলেন, “পাখিরা যখন একসঙ্গে ডানা ঝাপটিয়ে আকাশে উড়তে থাকে, তখন মনে হয় প্রকৃতি তার সব সৌন্দর্য এক জায়গায় ঢেলে দিয়েছে। ছবিতে বা ভিডিওতে যে সৌন্দর্য দেখা যায়, এখানে এলে তা বাস্তবে অনুভব করা যায়। কিছু সময় প্রকৃতির মাঝে কাটালে মনটাই হালকা হয়ে যায়।”

আরেক দর্শনার্থী মনির হোসেন বলেন, “ঝোপখালীতে সারা বছরই কিছু পাখি দেখা যায়, তবে শীতের সময়টা আলাদা। এই সময় অনেক ধরনের অতিথি পাখি একসঙ্গে দেখা যায়। সকালে কিংবা বিকেলে জলাভূমির পাড়ে দাঁড়িয়ে পাখিদের চলাফেরা দেখলে সময় কীভাবে কেটে যায় বোঝাই যায় না।”

স্থানীয় এক মাঝি বলেন, “আমরা যখন খালের পাড় ঘেঁষে ট্রলার চালিয়ে যাই, তখন চারপাশে হাজার হাজার পাখি দেখতে পাই। কখনো তারা জলের বুকে ভেসে থাকে, আবার হঠাৎ দলে দলে উড়ে যায়। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে কিচিরমিচির শব্দ করতে করতে উড়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য খুবই মনোমুগ্ধকর। প্রতিদিন দেখলেও এই দৃশ্য কখনো পুরোনো লাগে না।”

পর্যটন উদ্যোক্তা ও পরিবেশকর্মী আরিফ রহমান বলেন, “এই অতিথি পাখিগুলো বরগুনা জেলার পর্যটনের একটি বড় সম্ভাবনাময় সম্পদ। পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ঝোপখালী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এক শ্রেণির অসাধু পাখি শিকারির তৎপরতায় প্রতিবছর আমরা অনেক পাখি হারাচ্ছি। শিকার বন্ধ না হলে এই সৌন্দর্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।”

তিনি বলেন, “সচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা এবং নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে এই জলাভূমিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।”

এ বিষয়ে বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, “ঝোপখালীকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি পরিযায়ী পাখিদের জন্য নিরাপদ অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা রয়েছে। জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং অবৈধ শিকার রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ডানার ডাকে জেগে ওঠে ঝোপখালীর জলাভূমি। প্রকৃতির এই অনন্য উপহার শীতের দিনে শুধু একটি স্থান নয়—এ এক অনুভব। যেখানে জলের বুকে ডানার ছোঁয়ায় জেগে ওঠে প্রাণ, আর প্রকৃতি নীরবে বলে যায়—ফিরে এসো, আবার ফিরে এসো।

Related Articles

Back to top button