বিশ্বকাপের মহাযুদ্ধ আজ

মেসি-ম্যাজিক নাকি স্পেনের তারুণ্য
অনলাইন ডেস্ক: বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে বাংলাদেশ সময় আজ গভীর রাতে মুখোমুখি এই অঙ্গনের দুই পরাশক্তি। একদিকে অভিজ্ঞতা, দৃঢ়তা আর লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ অভিযানের আবেগে উজ্জীবিত আর্জেন্টিনা; অন্যদিকে লামিনে ইয়ামালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গতি, তারুণ্য ও নিখুঁত পাসিংয়ে উজ্জ্বল স্পেন। তাই আজকের ফাইনালটি শুধু একটি শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ নয়, এটি যেন এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের লড়াইও। প্রশ্ন একটাই -শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি কি আবারও মেসির জাদুতেই রাঙাবে আর্জেন্টিনাকে, নাকি স্পেনের তরুণ তুর্কিরা নতুন যুগের সূচনা করে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরবে? উত্তর মিলবে ৯০ মিনিটের ‘মহাযুদ্ধ’ শেষে।
সবার চোখ আজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে। সবার পথ একদিকে। পৃথিবীর প্রায় সাড়ে আটশ’ কোটি মানুষের মধ্যে অধিকাংশই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে চোখ রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের সময় বিকাল তিনটা আর বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ফাইনালের বাঁশি বাজবে। মেট লাইফের গ্যালারিতে ৮৫ হাজার দর্শক সরাসরি ফাইনাল দেখলেও শত শত কোটি দর্শক উল্লাস করবেন টিভি পর্দায়। আর্জেন্টিনা লাতিন আমেরিকার ফুটবলের দেশ, আর ইউরোপের ফুটবলের প্রাণশক্তি স্পেন। লড়াইটা হবে ফিফা র্যাংকিংয়ের এক নম্বর শক্তির সঙ্গে ২ নম্বরের।
আজ দর্শকদের চোখ থাকবে মেসি কি করেন তা দেখার জন্য। চোখ থাকবে মেসিকে গতির লড়াইয়ে হারাতে স্পেনের লামিনে ইয়ামাল কি করেন সেটিও দেখার জন্য। এই দুজনের পেছনে রয়েছে ফুটবল রোমাঞ্চের অনেক গল্প। লামিন যখন শিশু, মেসি তখন পুরোপুরি ফুটবলার। ১৯ নম্বর জার্সি গায়ে খেলেন। ১৯ বছর বয়সে লামিন এখন খেলছেন ১৯ নম্বর জার্সি গায়ে, ফাইনাল খেলবেন আজ ১৯ জুলাই তারিখে। অনেক মিলের ছড়াছড়ি। লামিন বিশ্বকাপের প্রথম খেলেছেন বদলি। মেসিও তাই। লামিন বার্সালোনার সৃষ্টি, মেসিও তাই। এমন অনেক গল্প আছে। ছোট্ট লামিনের সাথে মেসির অনেক গল্পই মিলে যায়। মিলবে না শুধু আজ। দুজনের পথ আজ দুটি দিকে। দুই দেশের জন্য লড়াই। আজ তারা ১২০ গজের শত্রু। ফাইনাল জয়ের গল্পটা কে লিখবেন, সেটাই দেখার অপেক্ষা। লামিন ইয়ামালকে নিয়ে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসি বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ ফুটবলে লামিন নতুন তারকা। ওর জীবনটাই সামনে পড়ে আছে। ইতিহাস গড়ার অনেক সুযোগ আছে। আমরা আমাদের চেষ্টা করব।’
রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ৩০০ বছর স্পেনের শাসন থেকে বেরিয়ে এসেছিল আর্জেন্টিনা। দুই দেশের ফুটবলারদের ভাষাটাও তাই একই। তবে স্পেন আর আর্জেন্টিনার ফুটবলের মধ্যে ফারাক অনেক। কোনো প্রাচুর্য থেকে আসেনি আর্জেন্টিনা। রাস্তায় রাস্তায় খেলে নিজেদেরকে উচ্চাসনে তুলেছে। পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি ভক্ত তৈরি করে ফুটবল দুনিয়া শাসন করেছে। ভালোবাসা আর আবেগ যেখানে জড়িয়ে তার নাম আর্জেন্টিনা।
অন্যদিকে, স্পেন হচ্ছে প্রাসাদ থেকে আসা ফুটবলের ঐতিহ্য ধারণ করা এক দেশ। যারা টিকিটাকা ফুটবল খেলে ইউরোপ জয় করেছে। ফুটবল দুনিয়াটাকে দুই ভাগ করলে একদিকে লাতিন ফুটবল অন্যদিকে ইউরোপীয়ান ফুটবল। যদি আরও বলা হয় তাতে লাতিন আর ইউরোপের লড়াই হবে আজ বিশ্বমঞ্চে। যেখানে প্রতিটি বুটে দেখা যাবে ফুটবল নান্দনিকতার স্পর্শ। লাতিন ফুটবল বিশ্বকাপ জিতেছে ১০ বার, ইউরোপ জিতেছে ১২ বার। আজ বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসর। একদিকে স্পেন বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন আর অন্যদিকে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন।
স্পেন এবার নিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলছে। এর আগে ২০১০ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়। সেই দলের উত্তরসুরীরা বিশ্বকাপে স্পেন ফুটবলের ঝলমলে আলো ধরে রাখতে পারেনি। অথচ ইউরোপের ফুটবলে স্পেন চার বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে আর্জেন্টিনা ১৬ বার চ্যাম্পিয়ন। এসব পরিসংখ্যান কোনো কাজে আসবে না আজ। মাঠে কার শক্তি কতটুকু সেটি প্রমাণ হবে কৌশলের মারপ্যাঁচে। জিততে হলে গোল করতে হবে। আর্জেন্টিনার আছে এমন ফুটবলার যার পায়ের জাদুতে ফুটবল দুনিয়া মন্ত্রমুগ্ধ। ৩৯ বছর বয়সে এসেও মেসি দেখাচ্ছেন পরিশ্রম করে কিভাবে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে নিজের চাওয়া পূরণ করছেন।
আর্জেন্টিনাকে নিয়ে এবার অনেক কথা হয়েছে। অনেক সমালোচনা হয়েছে। সব সমালোচনার জবাব দিয়েছে মেসি, ম্যাচের পর ম্যাচ জিতে। গ্রুপ পর্বে চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর্জেন্টিনা নকআউটে গিয়ে খুব সহজে বাধাগুলো পেরেয়ে গেছেন তা বলা যাবে না। ম্যাচের শেষ পর্যন্ত টানতে হয়েছে। আর টেনে নিয়ে যাওয়ার সব গল্প লিখতে হয়েছে মেসির পা হতে। আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এই দলটাতে বিশ্বকাপ খেলা অভিজ্ঞ ফুটবলারের অভাব নেই। গোলও করতে পারছেন তারা। মেসির পাশাপাশি লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক এ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতেরো মার্টিনেজরা গোল করেছেন। তবে মেসি-ই হচ্ছেন আর্জেন্টিনার প্রাণশক্তি। তিনি পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন, যা বার বার দেখা গেছে। আর্জেন্টিনা এমন একটি দলে পরিণত হয়েছে, যারা খেলার শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত হেরে যায় না। নকআউটের সব ম্যাচের দিকে তাকালে এমন চিত্র দেখা যায়। প্রতিবারই দেখা গেছে চাপে পড়ে আর্জেন্টিনা জেগে উঠেছে।
স্পেনেরও আছে তুখোড় ফুটবলার মিকেল ওয়ারজাবাল। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বুকে পেরেক ঠুকেছেন জোড়া গোল করে। অধিনায়ক রদ্রি, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে। তাকে ঠেকানো কঠিন। আর্জেন্টিনার মাঝমাঠকে নষ্ট করে দিতে পারবেন। রক্ষণভাগে আছেন লেফটব্যাক মার্ক কুকুরেয়া- স্পেনের ফুটবলের নতুন তারকা। সেমিফাইনালে তার খেলা সবার নজর কেড়েছে। টিম স্পেন আজ মেসিকে ঠেকাতে উঠে পড়ে লাগবে। তবে শেষ হাসি ফুটবে কার মুখে সেটা দেখার জন্য খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য্য ধরতেই হচ্ছে।




