বর্তমানে ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ, সংস্কারে বড় বাধা: রেহমান সোবহান

অনলাইন ডেস্ক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেছেন, দেশের ঋণখেলাপিরা এখন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে এবং তারাই সংস্কারের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে সমস্যাটি ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং কাঠামোগত।

গতকাল রোববার (১৯ এপ্রিল) তিন দিনব্যাপী  সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম)-এর নবম বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিনে ‘সংস্কার নিয়ে মোহ: বাংলাদেশের গল্প’ শীর্ষক অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘পরিবর্তিত বিশ্বে উন্নয়ন চ্যালেঞ্জসমূহ এবং নীতিগত পদক্ষেপ।’

রেহমান সোবহান বলেন, সংস্কার মানে শুধু আইন প্রণয়ন নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রথমে আইন প্রণয়ন, এরপর প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সবশেষে ফলাফল মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই একটি সংস্কার সফল হতে পারে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য তাদের ভেতরে প্রয়োজনীয় অঙ্গীকার ও নেতৃত্বের অভাব দেখা যায়। অতীতে বড় সংস্কারগুলো তখনই সফল হয়েছে, যখন তা জনগণের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে যেমন ছয় দফা আন্দোলন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণভিত্তিক সমর্থন দুর্বল উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ইশতেহার জনগণের কাছে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি অনেক দলীয় সদস্যও নিজেদের ইশতেহার সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত নন।

আলোচকদের মধ্যে কতজন বাস্তবে সরকারে কাজ করেছেন বা সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে রেহমান সোবহান বলেন, এই অভিজ্ঞতা না থাকলে সংস্কারের প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন। কে সংস্কার চান, কে এর বিরোধিতা করেন এবং কেন অনেক সময় সংস্কার সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় না সরকারে কাজ না করলে তা অনেক সময় বোঝা যায় না।

অনেকের কাছে সংস্কারকে তাত্ত্বিক বা কেতাবি আলোচনার বিষয়বস্তু বলেও মনে করেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, ‘আমি যখন পরিকল্পনা কমিশনে কাজ করতাম, তখন আমার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। সেখানে দেখেছি যে সংস্কারকে আইন হিসেবে পাস করানো সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়, আসল সমস্যা হলো সেটিকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।’

পুলিশ সংস্কারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সংস্কারের সাফল্য যাচাই করতে হলে বাস্তব ফলাফল দেখতে যদি বলা হয় যে পুলিশকে জবাবদিহিমূলক করা হবে এবং তারা বাধ্যতামূলকভাবে অভিযোগ গ্রহণ করবে, তাহলে কয়েক বছর পর বাস্তবে কী হচ্ছে, তা পরীক্ষা করা উচিত। সাংবাদিকেরা থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করে দেখুক—পুলিশ কতটা সহজে তা গ্রহণ করছে। এটাই হবে সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রস্তাবিত সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সুপারিশ নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরেই এসব নিয়ে আলোচনা ও আংশিক বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ফল দেয়নি।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও অর্থের সঠিক ব্যবহার না হওয়াই বড় সমস্যা। ফলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা পাচ্ছে না।

ভারতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে বড় সংস্কারগুলো এসেছে শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ বিভক্ত থাকায় বড় ধরনের সংস্কারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ চাপ তৈরি করা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, বরং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দিকেও নজর দিতে হবে। একইসঙ্গে সরকারের মধ্যেও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

Related Articles

Back to top button