বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক, আলোচনার কেন্দ্রে ‘চিরাইয়া’

অনলাইন ডেস্ক: আমাদের সমাজে এমন কিছু বিষয় আছে যা বছরের পর বছর নীরবতার আড়ালে চাপা পড়ে থাকে। পারিবারিক সম্পর্ক, বিবাহ, সম্মান এই শব্দগুলোর ভেতরে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে এমন বাস্তবতা, যা প্রকাশ্যে আনা হয় না কিংবা আনা গেলেও তা সহজে গ্রহণ করা হয় না। ঠিক এমনই এক স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত বিষয় বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে নতুন করে জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ওয়েব সিরিজ ‘চিরাইয়া’।

গত মার্চে জিও হটস্টারে মুক্তির পর থেকেই সিরিজটি শুধু দর্শকপ্রিয়তাই অর্জন করেনি বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী আলোচনাতেও জায়গা করে নিয়েছে। বিনোদনের মোড়কে এটি এমন এক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা ভারতীয় সমাজে দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার বা উপেক্ষিত হয়ে এসেছে।

‘সম্পর্ক’ না ‘অধিকার’? 
হিন্দি শব্দ ‘চিরাইয়া’ অর্থ ছোট পাখি। নামের মধ্যেই যেন বন্দিত্বের এক প্রতীকী ইঙ্গিত। সিরিজটির কেন্দ্রীয় চরিত্র পূজা (প্রসন্ন বিশত) একজন শিক্ষিত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারী, যার বিশ্বাস সমতা ও স্বাধীনতায়। কিন্তু বিয়ের প্রথম রাতেই তার স্বপ্নগুলো তছনছ হয়ে যায় যখন সে স্বামী অরুণের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়।

এই ঘটনার চেয়েও বেশি নাড়া দেয় অরুণের প্রতিক্রিয়া সে এটিকে অপরাধ হিসেবে দেখে না বরং ‘নিজের অধিকারে থাকা সম্পদ’ ভোগ করেছে হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এখানেই সিরিজটি তুলে ধরে এক ভয়ংকর সামাজিক মানসিকতা, যেখানে বিয়ের বন্ধনকে নারীর ওপর পুরুষের মালিকানার লাইসেন্স হিসেবে দেখা হয়।

সংকট আরও গভীর হয় যখন পূজা পরিবারে আশ্রয় খুঁজে। কিন্তু সহমর্মিতার বদলে সে পায় চুপ থাকার পরামর্শ—‘সংসার বাঁচাতে মানিয়ে নিতে হবে।’ নিজের মা থেকে শাশুড়ি সবাই যেন একই সুরে কথা বলে। এই নীরব সম্মতি আসলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিগুলোর একটি।

নীরবতার দেয়াল ভাঙার চেষ্টা
সিরিজের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কমলেশ (দিব্যা দত্তা) যিনি প্রথমে এই সমাজের নিয়মকেই মেনে চলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেন, এই নিয়মই আসলে অন্যায়কে বৈধতা দিচ্ছে। তার এই পরিবর্তনই গল্পে এক মানবিক মাত্রা যোগ করে প্রমাণ করে, সচেতনতা তৈরি হলে পরিবর্তন সম্ভব।

চিত্রনাট্যকার দিব্য নিধি শর্মা ও পরিচালক শশান্ত শাহ এই সিরিজের মাধ্যমে কোনো একক ব্যক্তিকে দায়ী করেননি। বরং তারা দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি গোটা সমাজ অজান্তেই অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে। এখানে পুরুষ চরিত্রগুলো দানব নয় বরং ‘স্বাভাবিক মানুষ’, যারা বুঝতেই পারে না তাদের আচরণ কতটা ক্ষতিকর।

আইনের চোখে অপরাধ নয়, তবুও বাস্তবতা
ভারতে বৈবাহিক ধর্ষণ এখনো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত নয়। এর পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের আইন ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির একটি ব্যতিক্রম, যেখানে বলা হয়েছে, স্ত্রী প্রাপ্তবয়স্ক হলে স্বামীর জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে না।

এই আইনি অবস্থান আজও বহাল রয়েছে। সরকারের যুক্তি এ ধরনের আইন বিয়ের ‘পবিত্রতা’ নষ্ট করতে পারে এবং পারিবারিক কাঠামো ভেঙে দিতে অনেক পুরুষ অধিকার কর্মী ও আইনজীবী মনে করেন, এমন আইন হলে নারীরা বিচ্ছেদের সময় বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এর অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলা করতে পারে।

কিন্তু পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলে। ভারতের জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিবাহিত নারী স্বামীর মাধ্যমে যৌন সহিংসতার শিকার হন। তবুও এই বাস্তবতা আইনি স্বীকৃতি পায় না যা এক গভীর বৈপরীত্যের ইঙ্গিত দেয়।

‘চিরাইয়া’ ওয়েব সিরিজের একটি দৃশ্য। ছবি: স্ক্রিনশট

শিল্প যখন প্রতিবাদের ভাষা
‘চিরাইয়া’ মূলত একটি আয়না যেখানে সমাজ নিজের মুখ দেখতে বাধ্য হয়। এটি আইন পরিবর্তনের সরাসরি হাতিয়ার না হলেও, মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনতে পারে।

অভিনেত্রী দিব্যা দত্তার ভাষায়, এই বিষয়টি এতটাই ট্যাবু যে অনেক নারী নিজের কষ্টকেও ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেন। এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় বাধা। সেই নীরবতা ভাঙার সাহসই দেখিয়েছে এই সিরিজ।

প্রশংসা, বিতর্ক—দুই-ই
সিরিজটি মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্মতি (Consent) এবং মিসোজিনি (নারীবিদ্বেষ) নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। চলচ্চিত্র সমালোচকেরা বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপনের জন্য প্রশংসা করলেও, রক্ষণশীল ও ট্রলকারীদের পক্ষ থেকে এটিকে ‘পুরুষবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে বয়কটের ডাকও দেওয়া হয়েছে।

পরিবর্তনের শুরু কোথায়?
বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একাধিক পিটিশন এখনো বিচারাধীন। আইনি পরিবর্তন কত দ্রুত হবে, তা অনিশ্চিত। তবে ‘চিরাইয়া’র মতো কাজগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে মানুষকে ভাবতে বাধ্য করছে।

কারণ, আইন পরিবর্তনের আগে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের সূচনা হয় প্রশ্ন তোলা থেকে।

‘চিরাইয়া’ ঠিক সেই প্রশ্নটাই তুলেছে বিয়ে কি সম্পর্ক, নাকি অধিকার? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন আলোচনায় গোটা দেশ।

Related Articles

Back to top button