জ্বালানির মজুত ধরে রাখতে কৃচ্ছ্রসাধনের পথে সরকার

অনলাইন ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটছে সরকার। জ্বালানি তেলের সাশ্রয় এবং অবৈধ মজুতদারি রোধে ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্পে সরবরাহ কমানো, অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান, ফিলিং স্টেশনে নজরদারি জোরদার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রমজানের ও ঈদের ছুটির বন্ধ বাড়িয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগেও বিদ্যুৎ-জ্বালানি সাশ্রয়ে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসি সূত্র জানায়, দেশে এখনো যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে এবং দেশের পথে জাহাজে থাকা তেল রয়েছে, তা দিয়ে এক মাস চলা যাবে। আর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও জটিলতা বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যমান ও নতুন উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহে অনিশ্চয়তা বা দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পাম্পে সরবরাহ কমেছে
জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ফিলিং স্টেশনগুলোতে গতকাল থেকে তেল সরবরাহ সীমিত করেছে। বিপিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, গত বছরের একই সময়ে একটি ফিলিং স্টেশন যে পরিমাণ তেল পেয়েছিল, গতকাল থেকে ঐ স্টেশনকে তার চেয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক গতকাল জানান, তারসহ অন্যান্য ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ ২০ শতাংশের মতো কমানো হয়েছে। তবে গ্রাহক প্রয়োজনের অতিরিক্ত না কিনলে সংকট হবে না। কেননা চাহিদা কমানোর বা সাশ্রয় করার কিছু পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণে বাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে। এতে মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। সেই ঝুঁকি এড়াতে সরবরাহ কমিয়ে মজুত দীর্ঘদিন ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পাম্পে দীর্ঘ সারি এবং ক্ষোভ
সরবরাহ সীমিত হওয়া এবং আতঙ্কে বেশি তেল কেনার প্রবণতার কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনগুলোতে গত কয়েক দিনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। তবে পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল হলে আজ সোম ও আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি কমে আসবে বলে তারা আশা করছেন। তবে অনেক ক্রেতা দাবি করেছেন, পেট্রোল পাম্প মালিকদের কেউ কেউ অবৈধ মজুতদারিতে কিংবা সরবরাহ আটকে রাখার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তা না হলে এত সংকট তৈরি হওয়ার কথা না।
অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান
অতিরিক্ত মজুত ও কালোবাজারি ঠেকাতে বিভিন্ন জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান গতকাল শুরু হয়েছে। প্রশাসন বলছে, কেউ অনুমোদনের বাইরে জ্বালানি তেল মজুত করলে কিংবা নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ফিলিং স্টেশনগুলোতে পুলিশ ও প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ টহলও বাড়ানো হয়েছে, যাতে কেউ অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ বা অবৈধভাবে মজুত করতে না পারে। জরিমানা হওয়া পাম্পগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজধানীর মহাখালীর সোহাগ ফিলিং স্টেশন। এটি গতকাল সাড়ে ৩ হাজার লিটার অকটেন স্টোর করে রেখেছিল। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পর তারা পুনরায় সরবরাহ চালু করে।
এদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে দেশের প্রধান তেল ডিপোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ডিলাররা বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, খুলনার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং বরিশালের ডিপোগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এসব স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হওয়ায় নিরাপত্তা জোরদার জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে পদক্ষেপ
জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে সার-কারখানাগুলো বন্ধের পর আজ সোমবার থেকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল এ নির্দেশনা-সংক্রান্ত চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকলে বিদ্যুৎ ব্যবহার কিছুটা কমবে এবং জ্বালানি তেলের ওপর চাপও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা না করতে সরকারের নির্দেশনা অনেক স্থানেই পালিত হচ্ছে না বলে দৃশ্যমান।
জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধি
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিমান চলাচলেও। দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচলে ব্যবহৃত জেট-এ১ (এভিয়েশন ফুয়েল) জ্বালানির মূল্য বাড়িয়ে নতুন হার নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন মূল্য গতকাল রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটে লিটার প্রতি ৯৪ টাকা ৯৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৫ টাকা ১২ পয়সা নির্ধারণ হয়। কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করসহ অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ব্যবহৃত জেট-এ১ জ্বালানির দাম প্রতি লিটার ১১২ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মাসের তুলনায় এ দাম ১৭ টাকা ২৯ পয়সা বেশি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনাকারী দেশি ও বিদেশি এয়ারলাইন্সের জন্য শুল্ক ও মূসকমুক্ত জেট-এ১ জ্বালানির মূল্য প্রতি লিটার ০.৭৩৮৪ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে এ হার ছিল প্রতি লিটার ০.৬২৫৭ ডলার।
দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই
তবে আপাতত অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন ও ডিজেলের খুচরা দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে সরকার। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দাম না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামলানোর সম্ভাব্য উপায় ও কৌশল নিয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে খারাপ হলে হয়তো দাম বাড়ানোর দিকে যেতে হতে পারে। গতকাল এক অনুষ্ঠানে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেই। জ্বালানি তেল চোরাচালান বা কালোবাজারে যাতে না যায়, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত রেশনিং
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত বাড়তে শুরু করেছে জানিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি তেল রেশনিং করে ব্যবহার করতে হবে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী জানান, রবিবার দুপুরে একটি তেলবাহী জাহাজ দেশে নোঙর করেছে এবং আরেকটি জাহাজ বিকাল দুইটার দিকে নোঙর নেওয়ার কথা রয়েছে। এই দুই জাহাজ থেকে জ্বালানি খালাস হলে দেশের মজুত আরও বাড়বে। তবে মজুত বাড়লেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে জ্বালানি ব্যবহার করা যাবে না। তিনি বলেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে, তা কেউ জানে না। তাই মজুত সাশ্রয় করতে সরকার রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছে এবং জনগণকে তা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
রেশনিংয়ে ভর করেছে আতঙ্ক
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে পাম্পের কেনাকাটায় রেশনিংয়ের ঘোষণা দেয় সরকার। আর গতকাল থেকে ডিপো থেকে পাম্পগুলোকে বরাদ্দে ২০-২৫ শতাংশ কম তেল দেওয়া হচ্ছে। রেশনিংয়ের এমন ঘোষণায় আতঙ্ক বেশি ছড়িয়েছে বলে কয়েকটি পাম্প স্টেশনের মালিক-কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও গুজব ও অপতথ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
বিপিসির প্রজ্ঞাপন অনুসারে একটি মোটরসাইকেলে দিন দুই লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।




