জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প খুঁজছে সরকার

- সংকট ঈদের ছুটি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে :জ্বালানিমন্ত্রী
- গ্যাসের রেশনিং শুরু
- সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং আলোকসজ্জা ও ব্যক্তিগত গাড়ি পরিহারের আহ্বান
অনলাইন ডেস্ক: ইরানে ইসরায়েলের হামলার পরে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি ও কাতারে ইরানের হামলার কারণে দেশ দুটি তাদের এলএনজি উত্পাদন এবং তেল উত্তোলন ও শোধনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ এলএনজি, অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসসহ (এলপিজি) প্রায় সব জ্বালানির সিংহভাগই আনা হয় মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশ কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান থেকে। অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও জ্বালানি সংকটে পড়তে যাচ্ছে। স্পট মার্কেটেও এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না।
এই অবস্থায় বাংলাদেশ জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে গ্যাস সরবরাহে রেশনিং শুরু করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে বিদ্যুতে শিডিউল করে লোডশেডিং শুরু হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকেও পরিস্থিতি বিবেচনায় সাশ্রয়ী ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গতকাল মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে জরুরি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পর্যালোচনা সভায় সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব, বিপিসির চেয়ারম্যান, পিডিবি’র চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
পর্যালোচনা সভা শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বর্তমান সংকট ঈদের ছুটি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ছুটির সময়ে শিল্প-কারখানার কার্যক্রম কমে গেলে বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে, ফলে চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ডিজেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে—উল্লেখ করে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, হঠাত্ ডিজেল বিক্রি বেড়ে গেছে। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের ওপারে দাম বেশি থাকায় কিছু পরিমাণ ডিজেল পাচার হয়ে যেতে পারে। এজন্য সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক করা হয়েছে। প্রয়োজনে সীমান্ত অঞ্চলে ডিজেল বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে কিছু এলাকায় বিক্রি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ শুরু হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; বৈশ্বিক বাজারে সবাই এখন জ্বালানি সংগ্রহে প্রতিযোগিতায় আছে। আমরা স্পট মার্কেট থেকেও কেনার চেষ্টা করছি, তবে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাই যতটুকু মজুত আছে, তা সাশ্রয় করে ব্যবহারের বিকল্প নেই। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি সরকার নিয়মিত পর্যালোচনা করছে। প্রতিদিন প্রধানমন্ত্রীকে বৈশ্বিক ও দেশীয় জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করা হচ্ছে। তবে আপাতত বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা নেই।
মন্ত্রী বলেন, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টই এখন প্রধান কাজ। আমাদের হাতে যে সরবরাহ আছে, সেটাকে সাশ্রয়ীভাবে ব্যয় করেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শিগিগরই মন্ত্রণালয় থেকে বিস্তারিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলেও তিনি জানান।
এদিকে গতকাল থেকে গ্যাসে রেশনিং কার্যক্রম শুরুর কথা জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক। পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান বলেন, আজকে (বুধবার) থেকেই সরবরাহ রেশনিং করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। হয়তো একটি সার কারখানা থাকতে পারে। গ্যাস-সংকটের কারণে বিদ্যুতে সরবরাহ কমানোর পাশাপাশি, সার কারখানায় উত্পাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। তিনি জানান, স্পর্ট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার জন্য ৩ মার্চ দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো দরদাতা পাওয়া যায়নি। ৪ মার্চ (গতকাল) আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, মার্চের চারটি কার্গো ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ১৫ মার্চ এবং ১৮ মার্চের দুটি কার্গো নিয়ে চিন্তায় আছি। আমরা কাতার গ্যাসকে চিঠি দিয়েছি, তারা এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। তারা ফিরতি চিঠিতে লিখেছে চুক্তির জরুরি অবস্থার শর্ত যুক্ত হতে পারে। এতে আমরা বিকল্প চিন্তাও করতে পারছি না। যে কারণে দৈনিক ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে আগামী সাত দিনে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন সাশ্রয় হবে।
গতকাল সন্ধ্যায় বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার, ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে পাবলিক বাহন ব্যবহার, খোলাবাজারে ডিজেল, পেট্রোল বিক্রয় না করাসহ একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
এতে আরো বলা হয়েছে, খোলা বাজারে ডিজেল, পেট্রোল বিক্রি বন্ধে ব্যবসায়ীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তত্পর হওয়ার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বর্ডারগার্ড বাংলাদেশকে জ্বালানি পাচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়াও, বৈশ্বিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে সম্ভাব্য সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জ্বালানি সংগ্রহ স্বাভাবিক রাখতে সব উত্স থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাময়িক সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগসমূহ সফল করার জন্য জনগণকে ধৈর্যধারণ করে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।




