শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরল বিনিয়োগকারীদের

অনলাইন ডেস্ক: দীর্ঘদিন পর নানা অনিশ্চয়তা, আস্থা সংকট—সবকিছুকে পেছনে ফেলে বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা গেল দেশের শেয়ার বাজারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ দেখা দিয়েছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা ও চট্টগ্রাম উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই (ডিএসই ও সিএসই) মূল্যসূচকের বড় উত্থান হয়েছে। বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণও।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শুধুমাত্র আস্থার সংকট কাটলেই যে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে তার বড় উদাহরণ বিনিয়োগকারীদের এই অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটতেই বাজার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের এই আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে অর্থনৈতিক সংস্কার, সুদহার নীতি, ডলার বাজারে স্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব বাজারে ভালো শেয়ারের জোগান বাড়াতে হবে। এজন্য ভালো কোম্পানি আনতে হবে। একই সঙ্গে বাজারসংশ্লিষ্টরা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে বলেছেন, হুজুগে শেয়ার কেনা যাবে না। অবশ্যই ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
সরকারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনের পর বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট কাটতেই বাজারে গতি সঞ্চার হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের ওপর বিনিয়োগকারীরা জোরালো আস্থা রেখেছেন। তবে বাজারের এই ইতিবাচক গতি ধরে রাখা শেষ পর্যন্ত সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর উন্নতির ওপর নির্ভর করবে।
আইসিবি চেয়ারম্যান বলেন, এসব সূচকের মধ্যে রয়েছে সুদহার যৌক্তিকীকরণ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আনা, ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের র্যাংকিংয়ে উন্নতি, দেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সঠিক সময়ে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করা। আবু আহমেদ বলেন, সার্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকা নির্ভর করবে এই চ্যালেঞ্জগুলো কতটা কার্যকরভাবে এবং দ্রুততার সঙ্গে মোকাবিলা করা হচ্ছে তার ওপর। তিনি সতর্ক করে বলেন, গতকাল শেয়ার বাজারে এক দিনেই প্রধান সূচক ২০০ পয়েন্ট বেড়েছে। এটা ইতিবাচক। কিন্তু শেয়ার বাজারের উন্নতি নির্ভর করবে সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রগতির ওপর। তিনি সরকারের কাছে দ্রুত ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল বিএনপির নেতা ও স্পন্সরদের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বেশি বেড়েছে। এদিন ডিএসইতে ৭৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট দাম বাড়ার সর্বোচ্চ সীমায় (সার্কিট ব্রেকার) লেনদেন হয়েছে। এই বাজারে লেনদেনকৃত মোট কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ৩৬৪টির, কমেছে ২৬টির। আর মাত্র চারটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ২০০ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩০ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১২৭ পয়েন্টে আর বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৮৬ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে উঠে এসেছে। সবকটি মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৭৯০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে ৪৮৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পর ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হলো।
ডিএসইতে গতকাল টাকার অঙ্কে লেনদেনের ভিত্তিতে শীর্ষে থাকা ১০ কোম্পানি হলো সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্র্যাক ব্যাংক, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন, রবি, সায়হাম কটন, যমুনা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ওরিয়ন ইনফিউশন। অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) গতকাল সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই বেড়েছে ৪৮৪ পয়েন্ট। এদিন এই বাজারে লেনদেন হয়েছে ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
শেয়ার বাজারে গতকাল সূচকের এ বড় উত্থান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাবেক সভাপতি ও আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও মহাব্যবস্থাপক মাজেদা খাতুন ইত্তেফাকে বলেন, এই উত্থানের পেছনে বড় কারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা। নির্বাচনের পর বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ দেখা দিয়েছে। তবে আমাদের বাজারের গভীরতা কম। এটা বাড়াতে দ্রুত ভালো ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে হবে। বাজারে ভালো শেয়ারের জোগান বাড়াতে হবে। পুঁজিবাজারের স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেছেন, বিএনপি পুঁজিবাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং এ খাতের সংস্কার ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছে। নির্বাচনের বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে। তারই প্রতিফল দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বাজারের এই ভালো পরিস্থিতি স্থায়ী করতে হলে দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানির শেয়ার আনতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগবান্ধব পলিসি নিতে হবে। বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের এই আস্থা স্থায়ী হবে।




