এখন ঘুরছেন ডিজেলের জন্য হন্যে হয়ে

সংকট পিছু ছাড়ছে না হাওরের কৃষকের

অনলাইন ডেস্ক: সিলেটের হাওরে যেন সংকট কাটছে না। দিনে দিনে নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। আগের জলাবদ্ধতা সমস্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি সমস্যা। ধান দ্রুত কেটে ঘরে আনার জন্য হারভেস্টার মেশিনের জন্য ডিজেল তেলের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন কৃষকেরা। আবার অনেক স্থানে জলাবদ্ধতার জন্য ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন নামানো যাচ্ছে না। বিকল্প হিসাবে ধান কাটার শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে দিনের বেলা সাজের আড়ালে সূর্য হাসি দিলেও রাতের বৃষ্টি হাওরগুলোর জলাবদ্ধতা সমস্যার উন্নতি হতে দিচ্ছে না। যদিও ইতিমধ্যে সুনামগঞ্জে ১২ উপজেলায় হাওর রক্ষা বাঁধের ৪০টি স্থানে বাঁধ কেটে দিয়ে পানি বের করা হচ্ছে। এবার ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০৩ কিলোমিটার অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার বোরা ধান রক্ষায়। কিন্তু কৃষকেরা এ ধান নিরাপদে ঘরে তেলা নিয়ে এখন আশা-নিরাশার দুলা চালে। 

সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোশারফ হোসেন ইত্তেফাককে শনিবার বলেন, মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস নেই। তবে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এবার সুনামগঞ্জে  বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় গত শুক্রবার পর্যন্ত ৪ হাজার ৯৮ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে। এর মধ্যে ৫০ ভাগ জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৩ হাজার ১২৬ হেক্টর জমি ধান কাটা হয়েছে মাত্র। আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহে হাওরে ধান কাটা শেষ হবে। এবার সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরা ধান আবাদ হয়েছে। এতে ৯২টি ছোট-বড় হাওরে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উত্পাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, কৃষকের চাহিদা মেটাতে রেশনিং পদ্ধতিতে হারভেস্টার মেশিনের জন্য তেল দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও কৃষি অফিসার মিলে স্লিপ দিলেই কম্বাইন্ড হারভেস্টার বা রিপার মেশিনের মালিক বা চালকদের কাছে তেল (ডিজেল) বিক্রয় করা হবে।

এদিকে যেসব হাওরে ধান পেকেছে সেখান থেকে দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য তাগাদা দিলেও দ্রুত ধান কাটার জন্য কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন নামানো যাচ্ছে না জলাবদ্ধতার জন্য। অনেক স্থানে আবার জ্বালানি-সংকটের কারণে হারভেস্টার মেশিনও চালানো যাচ্ছে না। ধান কাটার শ্রমিকও সংকট। এবার বছরের শুরুতেই হাওরে ধান কেটে গোলায় তোলার লড়াই শুরু হয়। হাওরের অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধও কোথাও কোথাও ফসলের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল থেকে ফসল রক্ষায় প্রতি বছরের মতো এবারও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে সিলেটে ১৪৮ কোটি টাকার অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। কৃষকেরা জানান, কোন কোন স্থানে এই হাওর রক্ষা বাঁধ হয়েছে গলার কাঁটা। অসময়ে ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা কৃষকের সর্বনাশ ঘটিয়েছে। কৃষি বিভাগ বলেছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ার চিন্তাভাবনা হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মদনপুরের কৃষক আব্দুল্লাহ মিয়া ৩০ একর জমি চাষাবাদ করেছিলেন দেখার হাওরে। শ্রমিক লাগিয়ে দুই দিনে সাত কেয়ার জমির ধান কেটেছেন। বাকি পাকা ধান কেমনে কেটে ঘরে তুলবেন—তা নিয়ে দুশ্চিন্তায়। একই এলাকার গোবিন্দপুরের কৃষক সাবেক ইউপি সদস্য ইকবাল আহমদ বললেন, হারভেস্টার মেশিনের মালিক-চালকরা তেল পাচ্ছেন না। 

সদরের নিয়ামতপুর গ্রামের হারভেস্টারের মালিক আব্দুল হক জানালেন, বৃহস্পতিবার এক ঘণ্টায় প্রথমে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার শনাক্তকরণ স্লিপ, পরে কৃষি কর্মকর্তা এবং ইউএনও’র স্বাক্ষরে প্রত্যয়ন নিয়েছি ২০০ লিটার তেলের ক্রয় করব বলে। শহরের ওয়েজখালির পাম্পে গেলে তারা, ১০০ লিটারের বেশি দিতো পারবে না বলে জানায়। পরে ২১ কিলোমিটার দূরের অপর একটি পাম্প থেকে তিনি তেল সংগ্রহ করেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তেলের স্লিপ নিয়ে আট জন হারভেস্টার মালিকই এভাবে পাম্পে পাম্পে ঘুরেছেন। কৃষকরা বলেছেন, তাতে ধান কাটতে বিলম্ব হবে। যে কোন সময় ঢল নেমে পাকা ধান তলিয়ে দেবে। অনেক স্থানে ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এবার তারও সংকটে। বোরা ধানও ঝুঁকিতে পড়বে। সুযোগে অনেকেই লুকিয়ে ১০০ টাকা লিটারের ডিজেল ১৩০- ১৪০ টাকা বিক্রয় করছেন। 

মাটিয়ান হাওরে প্রায় ৩৬ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করে কৃষক মাফি আলম বিপদে। ধান কাটার শ্রমিক পাচ্ছেন না। তেলের দাম বেড়েছে। মেশিন পাওয়া গেলেও দ্বিগুণ টাকা গুনতে হয়। এতে ধান কাটতেও বিলম্ব হচ্ছে। ২৪ বিঘা জমি করে একই অবস্থায় আরেক কৃষক মো. হাকিম উদ্দিন। প্রতি ঘণ্টায় কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রের মালিকরা জানান প্রতি মেশিনের জন্য দৈনিক ১০০ লিটার ডিজেল দরকার । নতুবা কৃষকরা ঝামেলায় পড়বেন।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জেলায় ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন সচল আছে ৬০২টি। রিপার মেশিন ১৫৫টি। অন্য জেলা থেকেও কিছু ধান কাটার যন্ত্র হাওরে এসেছে। হাওর জুড়ে জ্বালানি তেলের স্বল্পতার কারণে হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটার কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানিয়েছেন, জেলায় জ্বালানি তেলের সংকট নেই। বিধি মোতাবেক স্লিপ নিয়ে তেল ক্রয় করা যাবে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রতিটি উপজেলায় কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি প্রয়োজনে বাঁধ কেটে পানি অপসারণ করবে। আগামী বছর থেকে প্রয়োজনীয় স্থানে স্লুইসগেট নির্মাণ করা হবে।

Related Articles

Back to top button