বৃষ্টি-জলাবদ্ধতা শ্রমিকসংকট
দিরাইয়ের হাওরে পাকা পাকা ধান নিয়ে শঙ্কায় কৃষক

অনলাইন ডেস্ক: হাওরাঞ্চলের সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক। অকাল বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং শ্রমিক সংকট একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় সময়মতো ধান কাটতে না পারার আশঙ্কা করছেন তারা। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে দিরাই উপজেলার মোট ৩০ হাজার ১৭৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ১৩ হাজার ৮৮১ হেক্টর, উফশী ১৬ হাজার ২১৭ হেক্টর এবং স্থানীয় জাত ৮০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৭ মেট্রিক টন ধান।
এদিকে উপজেলার ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৩৯টি হাওরের মধ্যে অধিকাংশ হাওরের ধান ইতিমধ্যে পরিপক্ব হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক হাওরে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে ধান কাটার কাজে বিঘ্ন ঘটছে। কৃষি বিভাগ বলছে, এ বছর উপজেলায় নিজস্ব ৭৩টি কম্বাইন হারভেস্টার এবং ভাড়ায় চালিত আরো প্রায় ৪০টি মেশিন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় এসব মেশিন ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে কৃষকদেরকে আবারও শ্রমিকনির্ভর হতে হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আগে ধান কাটার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা হাওর এলাকায় আসতেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মেশিনে ধান কাটানোর জন্য সেই প্রবণতা কমে গেছে। এতে শ্রমিক সংকট আরো প্রকট হয়েছে।
বরাম হাওরের কৃষক শাহ জাহান বলেন, ‘আমার প্রায় ৮-১০ কেয়ার জমিতে ধান হয়েছে। ধান এখন পুরোপুরি পেকে গেছে, কিন্তু জমিতে পানি জমে থাকায় মেশিন নামাতে পারছি না। আগে হলে বাইরে থেকে শ্রমিক এনে কাজ করানো যেত, এখন শ্রমিকই পাওয়া যাচ্ছে না। যারা আছে তারা বেশি মজুরি চাচ্ছে। প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি, কখন আবার বৃষ্টি নামে এই ভয় কাজ করছে। যদি পানি আর একটু বাড়ে, তাহলে পাকা ধান পানির নিচে চলে যাবে। তখন আমাদের সারা বছরের কষ্ট একেবারে শেষ হয়ে যাবে।’
টাংনি হাওরের কৃষক আব্দুল বাসিত চৌধুরী বলেন, ‘গত বছর এক কেয়ার জমির ধান কাটতে প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। এবার সেই খরচ ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। খরচ বাড়লেও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা অনেক জায়গায় যোগাযোগ করেছি, কিন্তু শ্রমিক আসতে চাচ্ছে না। এদিকে বৃষ্টি হচ্ছে, হাওরে পানি জমে আছে, আবার শিলাবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল আসারও ভয় আছে। এত কষ্ট করে ধান ফলিয়েছি, কিন্তু সময়মতো কাটতে না পারলে সব নষ্ট হয়ে যাবে এই দুশ্চিন্তায় আমরা দিন কাটাচ্ছি।’
কৃষক আলী নূর বলেন, ‘আমরা এখন এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে আছি। কখনো রোদ, আবার হঠাৎ বৃষ্টি এমন আবহাওয়ায় ধান শুকানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। ধান কাটার পর শুকাতে না পারলে গুণমান নষ্ট হবে, দামও কমে যাবে। একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে ঝুঁকিও বেড়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে এবং দ্রুত ধান কাটা সম্ভব না হলে চলতি মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন তারা। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে হাওরের সোনালি ফসল ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে জানান কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনোরঞ্জন অধিকারী বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। দ্রুত ধান কাটার জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেসব জায়গায় মেশিন ব্যবহার সম্ভব নয়, সেখানে বিকল্পভাবে শ্রমিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
হাওর রক্ষাবাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, ‘হাওরের পরিস্থিতি আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি। কৃষকদের ধান দ্রুত ঘরে তুলতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।’




