মাদকসহ গ্রেপ্তার শিশু

পদে পদে লঙ্ঘিত শিশু আইনের প্রয়োগ

অনলাইন ডেস্ক: মাদক বহন করছিল একটি শিশু। ১৬ বছরের সেই শিশুটি তখন জনতার হাতে আটক হয়। দেওয়া হয় গণপিটুনি। পরে পুলিশ এসে উদ্ধার করে। দায়ের করা হয় শিশুটির বিরুদ্ধে মামলা। কিন্তু শিশুটিকে কে মাদক দিয়েছে, কারা তাকে গণপিটুনি দিল সে বিষয়ে পুলিশ কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম শিশু আদালত-১-এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ সাইফুর রহমান।

একই সঙ্গে শিশু আইনের কার্যকর প্রয়োগের ওপর একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। বিচারক বলেছেন, শিশুর কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ নিজে বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। অথচ সেই শিশুকে প্রহারের ঘটনায় তারা চোখ বন্ধ করে রয়েছেন। একই পুলিশ কর্মকর্তার হাতে আইনের দুই রকম প্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে শিশুটিকে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনায় পর্যবেক্ষণ দিয়েছে আদালত।

এতে বলা হয়েছে, একটি ১৬ বছরের শিশুকে এভাবে গণপিটুনির শিকার হতে দেওয়া কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছে বলে সন্দেহ হলেও তাকে মারধর করার অধিকার কারো নেই। অপরাধের বিচার করবে আদালত, রাস্তার জনতা নয়। এই নীতি একজন প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, একটি শিশুর ক্ষেত্রে আরো কঠোরভাবে প্রযোজ্য। আদালত এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে শিশুটিকে মারধরের ঘটনার তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। শিশুটিকে মাদক বহনের কাজে ব্যবহারের বিষয়ে শিশু আইনের অধীনে স্বতন্ত্র অপরাধের উপাদান বিদ্যমান আছে কি না, তা সুনির্দিষ্টভাবে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। আদালত বলেছে, কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা শিশুটিকে মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করেছে তা চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

গত ১৫ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার তামাকুমুন্ডি লেইন এলাকায় ১৬ বছরের শিশুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার কাছ থেকে ২১ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়। পরদিন শিশুটিকে হাজির করা হয় শিশু আদালতে। শিশুটিকে গ্রেফতার ও আদালতে হাজির করার পূর্ব পর্যন্ত শিশু আইনের যেসব বিধানাবলি পালনের দরকার ছিল তার কোনোটিই কার্যকর করেনি পুলিশ। এ প্রসঙ্গে শিশু আদালতের বিচারক বলেছেন, এই মামলায় শিশু আইনের ১৪ ধারার বিধান যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়নি। প্রবেশন কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে মর্মে নথিতে কোনো প্রমাণ নেই। পুলিশ ফরোয়ার্ডিংয়ে শিশুর পিতার নাম ও মোবাইল নম্বর লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু শিশুর পিতা-মাতাকে আদালতে হাজিরার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য অবহিত করা হয়েছে কি না, তার কোনো প্রমাণ নেই। কেন এরা অনুপস্থিত কারণ উল্লেখ করে কোনো প্রতিবেদনও দাখিল করেনি শিশু বিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা। এ প্রসঙ্গে আদালত বলেছে, এই ব্যত্যয় নিছক পদ্ধতিগত ত্রুটি নয়। একটি শিশু যেন তার পরিবার ও প্রবেশন কর্মকর্তার সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা ফৌজদারি মামলার বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি না হয়, এই আইন তা নিশ্চিত করেছে। কারণ প্রবেশন কর্মকর্তা শিশুর অবস্থা যাচাই করে আদালতকে সহায়তা করেন এবং পরিবার শিশুর পাশে দাঁড়ায়। এই দুই সুরক্ষা থেকে শিশুকে বঞ্চিত করা তার সর্বোত্তম স্বার্থের পরিপন্থি। এই শিশুটির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংশ্লিষ্ট বিধান প্রতিপালন না করা শিশু আইনের ১৪ ও ৪৫ ধারার লংঘন।

খাসকামরায় শিশুর বক্তব্য শোনেন বিচারক

আদালতে হাজিরার পর শিশুটিকে খাসকামরায় ডেকে নেন বিচারক। শিশুটি জানায়, এক ব্যক্তি তাকে কিছু মাদক অন্য একজনের কাছে পৌঁছে দিতে বলে এবং বিনিময়ে ২০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ক্ষুধার তাড়নায় সে এই কাজে রাজি হয়। এই বক্তব্য পর্যালোচনা করে বিচারক বলেছেন, এতে একটি চিত্র স্পষ্ট যে শিশুটি কোনো সংগঠিত মাদক ব্যবসায়ী নয়। ছিন্নমূল, ক্ষুধার্ত ও অসহায় শিশু। যার দুর্দশার সুযোগ নিয়ে তাকে সামান্য টাকার বিনিময়ে মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে শিশুটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। যদি কোনো শিশুকে কোনো বেআইনি কাজে ব্যবহার করা হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এই আইনে। শিশু আইনের ৭৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি কোনো শিশুর দ্বারা আগ্নেয়াস্ত্র বা অবৈধ ও নিষিদ্ধ বস্তু বহন করান বা পরিবহন করান, তবে সেই ব্যক্তি এই আইনের অধীন অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং তার জন্য তিনি অনধিক তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

গণপিটুনি দেওয়া হলেও আইনগত পদক্ষেপ নাই

শিশুটিকে আটকের পর গণপিটুনি দিয়ে আহত করা প্রসঙ্গে বিচারক বলেছেন, এ ধরনের কার্য আমলযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। এই অপরাধের তথ্য পুলিশের কাছে ছিল। শুধু কাছে ছিল তা নয়, তারা নিজেরাই তা তিনটি পৃথক দলিলে লিপিবদ্ধ করেছেন। তাহলে এই অপরাধের বিষয়ে পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে? কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। যদিও আইন এই বিষয়ে নীরব নয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারা পুলিশকে বাধ্য করে যে, কোনো আমলযোগ্য অপরাধের সংবাদ পাওয়ামাত্র তা প্রাথমিক তথ্যবিবরণী হিসেবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। বর্তমান মামলায় কোতোয়ালি থানা এর কোনোটিই করেনি। শিশুটিকে মারধরের ঘটনায় কোনো প্রাথমিক তথ্য বিবরণী লিপিবদ্ধ হয়নি। কোনো তদন্ত শুরু হয়নি। দায়ী ব্যক্তিদের পরিচয় নির্ধারণের কোনো চেষ্টাও দেখা যায় না। এমনকি শিশুটির আঘাতের প্রকৃতি নির্ধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ ডাক্তারি পরীক্ষারও ব্যবস্থা করা হয়নি। এটি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের আইনগত কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।

অথচ মামলায় দেখা যায়, শিশুটি যখন অভিযুক্ত তখন আইন তার প্রতি পূর্ণ গতিতে সক্রিয় হয়েছে। মামলা রুজু ও আলামত জব্দ, সাক্ষী নেওয়া এবং যথাসময়ে তাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। অথচ সেই একই শিশু যখন ভুক্তভোগী, তখন পুলিশ সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থেকেছে। একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইনের এই দুই রকম আচরণ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। এছাড়া, শিশুর পরিচয় যাতে কোনোভাবে প্রকাশ না পায় সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিচারক। বিচারক বলেছেন, শিশুর পরিচয় প্রকাশ পেলে তার ওপর সারা জীবনের জন্য একটি কলঙ্কের ছাপ পড়ে যেতে পারে, যা তার ভবিষ্যত্, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনকে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই কারণেই আইন শিশুর পরিচয় গোপন রাখাকে বাধ্যতামূলক করেছে।

Related Articles

Back to top button