রংপুরে চার খুন: উত্তর নেই অনেক প্রশ্নের

অনলাইন ডেস্ক: রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য হত্যার বিচারের দাবিতে স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ ও শোক মিছিল করেছে। এসময় রংপুর পুলিশ প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিন দিনের আলটিমেটাম বেঁধে দেয় তারা। হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের দাবি, এত দ্রুত তদন্তের একটি পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। তারা ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।

জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী নূর বলেন, হত্যাকান্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুজনকে জড়িত হিসেবে পুলিশের বক্তব্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। তার ভাষ্য, এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

গত শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসা থেকে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫২),  মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং  ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় রবিবার ভোরে পুলিশ মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে সিটি বাজারে মাছের দোকান কর্মচারী মুগ্ধ দাস (২৩) ও  বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে, স্বর্ণের দোকানে কারিগর সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই দিন বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন।

সেদিনই এক প্রেস ব্রিফিংয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে মাদক সেবন করছিল মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। এ ঘটনায় বাধা দেওয়ায় প্রথমে শিক্ষককে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর একে একে অন্য তিনজনকে হত্যা করা হয়।  হত্যার পরও দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করে অভিযুক্তরা। গোসল করেছে, খেজুর ও শসা খেয়েছে, আবার মাদক সেবন করেছে, স্বর্ণালংকার খুঁজেছে এবং মোবাইল ফোন পানিতে ডুবিয়ে রেখেছে। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল এটি পরিকল্পিত ডাকাতি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যায় তাদের সেই বক্তব্য। বলা হয়, ডাকাতির ঘটনা সাজানো হয়েছিল। অথচ পুলিশেরই দাবি বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার নেওয়া হয়েছিল এবং গ্রেপ্তারদের দেখানো স্থান থেকে সেগুলো উদ্ধারও করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন স্বর্ণালংকার যদি সত্যিই নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ডাকাতির বিষয়টি পুরোপুরি সাজানো বলা হচ্ছে কেন?

গতকাল শিক্ষার্থীদের সমাবেশে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাফিয়ার রহমান বলেন, ‘শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের হত্যার ঘটনায় নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। এই নাটক থেকে বেরিয়ে এসে সত্য উদঘাটন করতে হবে। আমরা সত্যকে জানতে চাই। খুনিকে আড়াল করার চেষ্টা করলে ফল ভালো হবে না।’ এসময় তিনি পুলিশ প্রশাসনকে খুনিকে আড়াল না করে সত্য উদঘাটন করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহবান জানান।

স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলার বলেন, ‘এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ওই বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কে কাটলো। চারজনকে হত্যা করা হলো আশে-পাশের কেউ টের পেলো না কেন। এরকম অনেক বিষয় আছে, সেগুলো ভালো করে তদন্ত না করেই, দুজনকে ধরে বলে দিলো এরা খুনের সঙ্গে জড়িত। আমরা এসব বুঝি না। আমরা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সত্য জানতে চাই।’

পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ পরিবারের: নিহত প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ যে কী করছে, কী হচ্ছে। পুলিশ বলছে ইয়াবাখোর দুজন নাকি এক এক করে চারজনকে মারছে।

গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিত্ রায় বলেন, পুলিশ যা বলছে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুইটা কম বয়সী ছেলে চারটা মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। আর ওই দুই ছেলের ফিজিক্যাল (শরীরের) যে অবস্থা তাতে তারা চারজনকে মারার ক্ষমতা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যেই আছে। হত্যার শিকার গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির আলমারি ও ড্রয়ার খুলে তছনছ করা ছিল। বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন ছিল। দুই তরুণ যে হত্যা করেছে, তা বিশ্বাস করতে চাইছে না তাদের পরিবার।

এদিকে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস বলেন, ‘আমি বিভিন্ন এলাকায় কীর্তন করে বেড়াই। আমার ছেলে সহজ সরল। পুলিশ রাতে আমার  বাড়িতে এসে ঘুম থেকে আমার ছেলেকে ডাকতে বলে। আমি ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে পুলিশের সামনে আনি। ছেলেকে তারা ধরে নিয়ে যায়। শুনেছি আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে। তাই বলে কাউকে খুন করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাস বলেন, ‘ছেলেটা কিছু ছেলের পাল্লায় পড়ে নেশা করে। তবে মানুষ খুন করা তো সহজ নয়।’

বিক্ষোভ-সড়ক অবরোধ : চার খুনের বিচার দাবিতে দুপুরে নগরীর কাচারীবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। এর আগে জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধন করে। পরে সেখান থেকে একটি শোক মিছিল বের করে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শোক মিছিল শেষে পুনরায় কাচারীবাজার জিলা স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে। সড়ক অবরোধকালীন সময়ে বক্তব্য রাখেন জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক সাফিয়ার রহমান, সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলারসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিস মোহাম্মদ বলে, চারজনকে হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়িতে গোসল ও খাওয়াদাওয়া করেছে-পুলিশের এমন বক্তব্য তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না। সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। মঙ্গলবার বিদ্যালয়ে নিহতদের স্মরণে প্রার্থনা শেষে সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি জানানো হবে।

এছাড়া বিকেলে নগরীর রংপুর প্রেসক্লাব চত্বরে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে মহানগর নাগরিক কমিটি। মানববন্ধন থেকে এই হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবি জানানো হয়। এসময় বক্তব্য রাখেন: মহানগর নাগরিক কমিটির আহবায়ক এডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ, মহানগর দোকান ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তানবির হোসেন আশরাফীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

এদিকে হত্যাকান্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর মহানগর আমির মাহবুবুর রহমান বেলাল দাবি করেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক যা বললেন: রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেছেন, চারটি মরদেহেরই ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, শ্বাসরোধ করে তাদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। মরদেহ থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। এসব নমুনা সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে। সেখান থেকে পাওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মতামত দেয়া হবে। নিহতদের মুখে রাসায়নিক পদার্থ বা অ্যাসিড ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পচন ধরার কারণে মুখমন্ডল এমন দেখাচ্ছে। অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

পাশাপাশি চিতায় উঠল চার লাশ: গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। নিহতের স্বজনরা জানান, রবিবার রাত ৮টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে চারটি মরদেহ তাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে রাত সাড়ে ৮টার নগরীর দখীগঞ্জ মহাশ্মশানে চারটি মরদেহ নিয়ে আসা হয়। পর পর চারটি চিতায় চারজনের মরদেহ তোলা হয়। স্বজনরাই মুখাগ্নি করেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে দাহকার্য শেষ হয়। এ সময় সেখানে স্বজনদের কান্নায় এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

দুই আসামির স্বীকারোক্তি: রংপুর মেট্রোপলিটন কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত)  মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জি জানান, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই তরুণ আদালতে স্বীকরোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তবে জবানবন্দিতে তারা কী বলেছেন, তা তদন্তের স্বার্থে তিনি বলতে চাননি। রবিবার রাতে রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-২ এর বিচারক এস এম রফিকুল ইসলাম অভিযুক্ত দুই আসামির জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এদিকে রংপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি শাহ বায়েজিদ আহমেদ তার ফেসবুক পোষ্টে লিখেছেন, রংপুর নগরীতে এক পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দাবি মাদক সেবনের দৃশ্য দেখে ফেলায় এই হত্যাকান্ড। গ্রেপ্তার দুই তরুণ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। কারণ গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আগে চুরি, ছিনতাই কিংবা স্থানীয় কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। শুধু মাদক সেবনের ঘটনা দেখে ফেলায় একটি পরিবারের চারজনকে হত্যার বিষয়টি মানতে পারছেন না নিহতদের স্বজন থেকে শুরু করে স্থানীয়রাও।

Related Articles

Back to top button