মূল হোতাসহ ২ আসামির স্বীকারোক্তি

মার্শাল আর্টের আড়ালে সদস্য সংগ্রহ ও উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করতেন তারা

অনলাইন ডেস্ক: রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে কথিত মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার সাত আসামির সবাই এখন কারাগারে। এর মধ্যে মামলার মূল হোতা শাহ আমানত সাবির ও মো. তাহসীন ইসলাম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্যদিকে রিমান্ড শেষে বাকি পাঁচ আসামিকেও আদালত কারাগারে পাঠিয়েছেন। মামলাটি এখন গভীর তদন্ত করছে পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)।

আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (১৮ জুলাই) ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামশেদ আলমের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আসামি মো. তাহসীন ইসলাম। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলামের আদালতে একই ধারায় জবানবন্দি দেন মামলার প্রধান আসামি শাহ আমানত সাবির। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত দুজনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) মহিন উদ্দীন জানিয়েছেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা এই মামলায় গ্রেপ্তার সাতজনের মধ্যে দুই আসামি অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। রিমান্ড শেষে বাকি পাঁচ আসামি—মো. হোসাইন তানিম, মো. জুনায়েদ, আতাউল্লাহ শাহ, মো. আবিদুর রহমান ও মো. বায়োজিতকে আদালতে হাজির করা হলে তাদেরও কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। ফলে মামলার সাত আসামির সবাই বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই যাত্রাবাড়ীর ‘মিনি কক্সবাজার’ এলাকার একটি বালুর মাঠে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ নামের একটি ব্যানারে মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে উগ্রবাদী তৎপরতা চালানোর অভিযোগে প্রথমে ছয়জনকে আটক করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মো. তাহসীন ইসলাম ওরফে সুলতান ওরফে মুসান্নাকে।

এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এ বি সিদ্দিকী বাদী হয়ে ১৬ জনকে আসামি করে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ৬, ৭, ১০, ১১, ১২ ও ১৩ ধারায় মামলা করেন। পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ‘সাবির ভাইয়ের জামাত’ নামে একটি সংগঠনের কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ নামে একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে মার্শাল আর্ট শেখানোর আড়ালে সদস্য সংগ্রহ ও উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। সদস্যরা ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে ছদ্মনামে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতেন বলেও পুলিশের দাবি।

যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় তাদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তিনি বলেন, এখন বিষয়টি আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করছে পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট। পলাতক অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কাজও চলমান রয়েছে।

এর আগে রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সাত আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পুলিশ আদালতের কাছে সাত দিনের রিমান্ড চাইলেও শুনানি শেষে তিন দিন করে রিমান্ড দেন বিচারক। রাষ্ট্রপক্ষ শুনানিতে দাবি করে, আসামিরা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে তৎপর ছিলেন এবং ধর্ম ও মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদী কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য, তারা খেলাফত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কাজ করছিলেন এবং অল্প বয়সী হওয়ায় আসামিরা কার প্রভাবে এ কাজে যুক্ত হয়েছেন, রিমান্ডে নিলে সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড আবেদন বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। তাদের দাবি ছিল, আসামিরা নির্দোষ এবং তাদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদ বা জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সঠিক নয়। আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে তারা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ দিতেন, এর বাইরে তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না বলে আদালতে দাবি করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

পুলিশের রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, তাহসীন ইসলামের কাছে সংগঠনের অন্য সদস্য, তাদের যোগাযোগব্যবস্থা এবং কার্যক্রম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। সেসব তথ্য যাচাই এবং পলাতক সদস্যদের শনাক্তের জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। সাবির ও তানিমকে এর আগে দুই দফায় ছয় দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। পরে সর্বশেষ ধাপে তাহসীনসহ অন্যদেরও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের কর্মকর্তা মহিন উদ্দীন বলেন, ‘গ্রেপ্তার সাত আসামির মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্যদের রিমান্ড শেষ হওয়ার পর আদালত কারাগারে পাঠিয়েছেন।’

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সত্যতা পাওয়ার পর তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এখন অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট মামলাটির গভীর তদন্ত করছে।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ছোট ছোট গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ, গোপন যোগাযোগ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার প্রবণতা বেড়েছে। যাত্রাবাড়ীর এই মামলায়ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংগঠনের কাঠামো তৈরি ও সম্প্রসারণের অভিযোগ উঠেছে। এ কারণেই মামলাটিকে শুধু একটি স্থানীয় প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ঘটনা হিসেবে নয়, সম্ভাব্য নেটওয়ার্কভিত্তিক উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতা হিসেবে দেখছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ নামের ব্যানার ব্যবহার করে যে কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল, তার আড়ালে সংগঠিত মতাদর্শিক তৎপরতা, সদস্য সংগ্রহ এবং গোপন যোগাযোগব্যবস্থা ছিল কি না, সেটি এখন তদন্তের মূল বিষয়। আদালতে দুই আসামির স্বীকারোক্তি এবং সাতজনের সবাই কারাগারে যাওয়ার পর মামলাটির তদন্ত এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

Related Articles

Back to top button