ধীরগতি কাটছে না রপ্তানি খাতে

১১ মাসের মধ্যে ৯ মাসই কমেছে রপ্তানি আয়
অনলাইন ডেস্ক: চলতি অর্থবছরের ১১ মাসের মধ্যে ৯ মাসেই দেশের রপ্তানি আয় কমেছে। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রপ্তানি খাতের ধীরগতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মে মাসের পতনের পেছনে ঈদের ছুটিকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও রপ্তানিকারকদের মতে, সংকটের মূল কারণ আরো গভীরে। বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্থর গতি, আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ক্রয়াদেশের ঘাটতি, চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উত্পাদন ব্যয় বৃদ্ধি রপ্তানি খাতকে চাপে ফেলেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে দেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৪০ কোটি ২৮ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের ৪৭৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের তুলনায় ৭ দশমিক ০৯ শতাংশ কম। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৭৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৪ হাজার ৪৯৪ কোটি ডলার। ফলে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আয় কমেছে ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
খাতভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উত্স তৈরি পোশাক খাত চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে খাতটির রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৬৫৫ কোটি ডলার। নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে হোম টেক্সটাইল, ওষুধ, প্লাস্টিকপণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং সাইকেল রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর মধ্যে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং সাইকেল রপ্তানি ২৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকদের মতে, রপ্তানি খাতকে টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরাতে হলে পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, আইসিটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাতকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে উত্পাদন ব্যয় কমাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো, দ্রুত কাস্টমস সেবা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাদেশ রপ্তানি খাতকে আরো সহনশীল ও টেকসই করে তুলতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, দেশের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণসহ কয়েকটি বিষয় কাজ করছে। আন্তজার্তিক বাজারে নানা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। তার মতে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো প্রধান বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ভোক্তা চাহিদা কমেছে। এর ফলে রপ্তানি আদেশও হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে।
অন্যদিকে দেশে উত্পাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহের সংকট, বিনিময় হার ওঠানামা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এছাড়া সীমিতসংখ্যক পণ্য ও কয়েকটি নির্দিষ্ট বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রপ্তানি খাতকে বহির্বিশ্বের ধাক্কার মুখে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে বলে জানানা এই অর্থনীতিবিদ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইত্তেফাককে বলেন, দেশের রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অর্ডারের ঘাটতি। তার মতে, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় ক্রেতারা আগের মতো অর্ডার দিচ্ছেন না। মূল্যবৃদ্ধির ফলে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের ভোক্তারা অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়েছে। ফলে রপ্তানির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর মতে, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে দেশীয় পণ্যের চাহিদা এখনো শক্তিশালী রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সময়ে স্পেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, কানাডা, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবেও রপ্তানি বেড়েছে। ইপিবির ভাষ্য, এটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরে।



