উপসাগরীয় অস্থিরতায় ঝুঁকিতে শ্রমবাজার, অনিশ্চয়তায় প্রায় ৬০ লাখ প্রবাসী

অনলাইন ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পালটা প্রতিক্রিয়ায় আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়তে থাকায় ঐ অঞ্চলে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত ও বাহরাইনে আরো কয়েক জন আহত হয়েছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর ৬৭ শতাংশই গেছেন সৌদি আরবে। কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্দান মিলিয়ে বাংলাদেশের বৃহত্ অংশের অভিবাসী শ্রমিক একই ভৌগোলিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এসেছে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো থেকে। রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও গ্রামীণ অর্থনীতির বড় ভিত্তি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহেও ভাটা পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এদিকে আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী যাওয়া প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও বাহরাইনে বাংলাদেশ মিশন সূত্রে জানা গেছে, একাধিক নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কাতার পরিস্থিতি বিবেচনায় এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সামগ্রিকভাবে শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও ভিসা-সংক্রান্ত বিষয়ে দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে আশ্বাস পাওয়া গেছে। 

তিনি বলেন, ‘সবদিকেই আমাদের আন্তরিকতা ও চেষ্টার কোনো কমতি নেই। এই সরকার জনগণের সরকার। তাই বাংলাদেশের নাগরিকরাই সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রমে সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাচ্ছে।’

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে উপদেষ্টা জানান—‘সৌদি আরব, ইউএই, কাতারসহ যুদ্ধ-প্রভাবিত অঞ্চলে থাকা আমাদের নাগরিকদের এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনে সরিয়ে নেওয়ার (ইভাকুয়েশন) প্রস্তুতিও রয়েছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে সহযোগিতা পাওয়া যায়।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বল্পমেয়াদি সংঘাত হলে বড় ধরনের প্রভাব না-ও পড়তে পারে; বরং পুনর্গঠন কার্যক্রমে শ্রমিকের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে। তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি হলে শ্রমবাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। তখন আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রবাসী দেশে ফিরতে চাইবেন, নতুন কর্মী নিয়োগও কমে যাবে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীদের অশ্চিয়তাও বাড়বে। আবার বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে জ্বালানিতে প্রভাব পড়বে। এলএনজি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা বাড়বে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘ইতিমধ্যেই আমাদের দুজন প্রবাসী মারা গিয়েছে। প্রথম তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করা। যুদ্ধের প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে এর স্থায়িত্ব ও বিস্তৃতির ওপর। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের জন্য বহুমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। গত দুই মাসে অনেকের ভিসা সম্পন্ন হলেও এখন যেতে পারছেন না। কুয়েত যেমন যুদ্ধের কারণে এক মাস ভিসার সময় বাড়িয়েছে। অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কথা বলে এটি করা যেতে পারে।’

Related Articles

Back to top button