সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন

নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনীতি ও পোশাক খাতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বাংলাদেশ
অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে জয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্থবির অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব। এক ওয়েবিনারে বক্তারা বলেছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রধান অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতার ওপরই নতুন সরকারের প্রতি ভোটারদের মূল্যায়ন নির্ভর করবে। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘বাংলাদেশ আফটার দি ভোট, ডেমোক্রেসি রিফ্রম ফরেইন পলিসি’ শীর্ষক সেমিনারে অংশ নিয়ে ‘কাউন্টার পয়েন্টের’ সম্পাদক জাফর সোবহান বলেন, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছিল আন্দোলনের একটি বড় কারণ, যা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পথ তৈরি করেছিল। নতুন সরকার কিছু সময়ের জন্য জনসমর্থনের সুবিধা পাবে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তিনি আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার, টাকার মান স্থিতিশীল রাখা এবং খেলাপি ঋণ কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি পেয়ে বিজয়ী হয় বিএনপি। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.৭ শতাংশে নেমে আসে, যা আগের বছর ছিল ৪.২ শতাংশ এবং ২০২৩ অর্থবছরে ছিল ৫.৮ শতাংশ। চলতি ও পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা সংকট এবং বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমেছে, যেখানে আগের কয়েক দশক ধরে তা ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে ছিল।

ওয়েবিনারের আলোচনায় বিশ্লেষকেরা বলেন, নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানর অভিজ্ঞতা দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে। স্পেন, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদ আখতার বলেন, নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ ও তরুণ প্রজন্মের সমন্বয় রয়েছে এবং মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়েছে।
রেটিং সংস্থা মোডি’স তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পরও আইনশৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন অবনতি ও পোশাক খাতে বিক্ষোভ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। নীতিগত দিকনির্দেশনা স্পষ্ট না হওয়ায় বিনিয়োগও কমে আছে। তবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদার, সংসদীয় কার্যক্রমে অগ্রগতি এবং বিনিময় হার আরও নমনীয় করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস মনে করছে, উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি থাকলেও বিএনপি বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতি বজায় রাখবে। সংস্থাটির মতে, আগামী নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বাণিজ্য সুবিধা কমে গেলে রপ্তানি আয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে এলডিসি মর্যাদার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারসহ নানা সুবিধা পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার পর ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা বাড়বে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিশ্লেষকেরা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে উদ্যোগ নেবেন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি সেখানে আশ্রয় নেওয়া এবং উভয় দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনার প্রেক্ষাপটে। ঢাকা ইতোমধ্যে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের আহ্বান জানিয়েছে এবং একটি ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, দুই দেশের মধ্যে শত্রুতার লক্ষণ দেখা যায়নি এবং পারস্পরিক সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করবে। তার মতে, অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলোতে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ অনেক।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি— এই চারটি ক্ষেত্রেই নতুন সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর আগামী দিনের রাজনীতি নির্ভর করবে।



