অভিজ্ঞদের সঙ্গে থাকছেন তরুণ ও মেধাবীরা

আন্দোলনের মিত্রদের নিয়ে গঠিত হচ্ছে ঐক্যের সরকার

অনলাইন ডেস্ক: প্রায় দুই যুগ পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। কারা স্থান পাচ্ছেন তার মন্ত্রিসভায়? দলের ভেতরে ও রাজনৈতিক মহলসহ সর্বত্র এখন এনিয়েই যত জল্পনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ প্রায় সর্বত্র এনিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ, অনুমান ও প্রত্যাশার কথা।

তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ ও বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, পুরোপুরি বিএনপি-দলীয় সরকার হচ্ছে না। তারেক রহমানের পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের মিত্রদের মধ্যে যারা এবার বিএনপির সঙ্গে আসন-সমঝোতায় নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন তাদের সমন্বয়ে গঠন হতে যাচ্ছে ঐক্যের সরকার। মিত্র দলগুলোর জয়ীদের একাধিকজনকে দেখা যাবে মন্ত্রিসভায়। এছাড়া, মিত্র দলগুলোর মধ্যে যারা সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন, তাদের কাউকেও মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। এমনকি মিত্র দলগুলোর শীর্ষনেতাদের যারা জয়ী হতে পারেননি, কিংবা নির্বাচনে আসন ছাড় পাননি- তাদের কেউ কেউও টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন, যদিও এই সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।

আর বিএনপির জ্যেষ্ঠ ও তরুণ নেতাদের মধ্যে যারা অভিজ্ঞ, দলের দুর্দিনে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন, আস্থাভাজন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির তারা থাকছেন তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায়। সবমিলিয়ে এবারের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞদের পাশাপাশি প্রাধান্য থাকছে তরুণ ও মেধাবীদের। জানা গেছে, মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে সকল বিভাগ-জেলার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। বিশেষত, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে উন্নয়ন-বঞ্চিত জেলাগুলো থেকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়ার বিষয়টি বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এছাড়া, মন্ত্রিসভায় এক বা একাধিক নারীর প্রতিনিধিত্বও থাকছে বলে জানা গেছে।

স্পিকার, অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী কে হচ্ছেন- এনিয়ে কৌতুহল বেশি

নতুন সংসদের স্পিকার কে হচ্ছেন, এর পাশাপাশি বেশি কৌতুহল হচ্ছে অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কারা আসছেন। জানা গেছে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরদিন থেকেই নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে দলের ভেতর-বাইরের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজনদের সঙ্গে দফায়-দফায় পরামর্শ করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংবিধান, আইন, কার্যপ্রণালী বিধি, রীতি-রেওয়াজ ও সংসদ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও দক্ষ একজনকেই দেখা যাবে নতুন সংসদের স্পিকার হিসেবে। যদিও স্পিকার মনোনয়নের বিষয়টি আসবে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকার পরে।

তবে, নতুন মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী কারা হচ্ছেন, এনিয়ে নানামুখী  বিশ্লেষণ ও জল্পনা চলছে। বিএনপি সূত্র জানায়, দলের ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতির আলোকে অর্থনীতিকে সামলে নিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে দক্ষ ও অভিজ্ঞকেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর দলের বৈশ্বিক নীতির আলোকে ভারসাম্যমূলক কূটনীতি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম- এমন কাউকেই করা হবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

কাল সকালে নির্বাচিতদের এবং বিকালে নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ

অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল গতকাল রবিবার জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করানো হবে। এরপর আগামীকালই বিকাল চারটায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান হবে।

নির্বাচিতদের সকালে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন। আর বিকালে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম সিরাজ মিয়া শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন।

নিয়ম অনুসারে, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি) শপথ গ্রহণের পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় সংসদীয় দলের নেতা ও সংসদ নেতা নির্বাচন করা হবে। এরপর দলের নেতা রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করবেন এবং তাকে জানাবেন যে সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের জন্য আবেদন করবেন। রাষ্ট্রপতি সংসদ নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন, যিনি পরবর্তীতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নির্বাচন করবেন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন প্রথমে প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করাবেন। এরপর মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রীদের শপথ পাঠ করাবেন।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানান, সংসদ ভবনে ‘শপথ কক্ষে’ নবনির্বাচিতদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। শপথ গ্রহণের পর নিয়ম অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা শপথ বইয়ে সই করবেন এবং পরিচয়পত্রের জন্য ছবি তুলবেন।

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নবনির্বাচিতদের শপথ পরিচালনা করবেন বলে তিনি ধারণা করেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের পরপরই বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে বিএনপি তাদের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করবে।

আইন উপদেষ্টা জানান, ঐতিহ্যগতভাবে বঙ্গভবনে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান হলেও এবার তা জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে। মন্ত্রিসভার শপথের জন্য দক্ষিণ প্লাজাকে বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান এবং জুলাই  ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর সাথে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ ও দক্ষিণ প্লাজা বিভিন্ন কারণে স্মরণীয়। এছাড়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার জানাজাসহ নানা কারণে স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এসব বিষয় বিবেচনা করেই সেখানে হয়তো শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে।

শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের বিষয়ে আইন উপদেষ্টা জানান, কনভেনশন অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আমন্ত্রণের বিষয়টি দেখছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সার্কভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু, বিদেশি কোনো প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রিত কিনা, সেবিষয়ে আমার জানা নেই।

দক্ষিণ প্লাজায় সুচারুভাবে অনুষ্ঠান আয়োজনে বিএনপির তিন নেতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বৈঠক

এদিকে, গতকাল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের শেষ বৈঠকের পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ‘সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান এই প্রথমবারের মতো হচ্ছে। অনুষ্ঠানটা কিভাবে পরিচালিত হবে, এটা যাতে সুন্দরভাবে হয়, সেজন্য আজকে (গতকাল) বিএনপির তিনজনের একটি কমিটির সঙ্গে মিটিং আছে। তারা এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।’ তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে যারা নতুন মন্ত্রিসভার শপথের দিন থাকবেন, তারা জয়েন করবেন। শপথের দিন তারা ফ্ল্যাগবাহী গাড়িতে যাবেন। যাওয়ার পরে যখন শপথ অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে, ফেরার সময়ও ওই গাড়ি তাদেরকে বাসায় পৌঁছে দেবে। কিন্তু, তখন আর গাড়িতে ফ্ল্যাগ থাকবে না।

উল্লেখ্য, নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টিতে জয় পেয়েছে। ফল  ঘোষণা স্থগিত থাকা দুটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা জিতেছেন। আর তাদের মিত্র দলগুলো পেয়েছে তিনটি আসন। অর্থাৎ বিএনপি ও তার মিত্ররা মিলে পেয়েছে ২১২ আসন। অন্যদিকে, জামায়াত এককভাবে পেয়েছে ৬৮টি আসন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্য শরিকেরা পেয়েছে ৯টি আসন। অর্থাৎ জামায়াত ও দলটির মিত্ররা পেয়েছে মোট ৭৭টি আসন।

Related Articles

Back to top button