পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব, সতর্কতা জারি

অনলাইন ডেস্ক: ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কাজ করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজ্যটিতে পাঁচজনের শরীরে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে এবং প্রায় ১০০ জনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। কলকাতার কাছাকাছি এলাকায় এ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় অতীতের প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাবের স্মৃতি ফিরেছে এবং নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, সংক্রমণের বর্তমান ক্লাস্টারটির সূত্রপাত হয়েছে কলকাতা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বারাসাতে। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত দুই নার্স এক গুরুতর অসুস্থ রোগীর সেবা দিতে গিয়ে জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন। পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পুরুষ নার্সের অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে থাকলেও নারী নার্সের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দুজনকেই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

যে রোগীর সেবা দিতে গিয়ে তারা আক্রান্ত হন, তিনি পরীক্ষার আগেই মারা যান। তবে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তাকেই সন্দেহভাজন ‘ইন্ডেক্স কেস’ হিসেবে ধরে তদন্ত চালাচ্ছে।

পরবর্তীতে একই হাসপাতালের আরও তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী—একজন চিকিৎসক, একজন নার্স ও একজন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। তাদের সবাইকে কলকাতার বেলেঘাটা সংক্রামক রোগ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় রাজ্য সরকার জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয় এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা প্রায় ১০০ জনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত ১৮০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে উচ্চঝুঁকিতে থাকা ২০ জনের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। তবে নিপাহ ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড ৪ থেকে ১৪ দিন হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪৫ দিন পর্যন্ত হতে পারে। সে কারণে কোয়ারেন্টিন শেষে তাদের পুনরায় পরীক্ষা করা হবে।

এ পরিস্থিতিতে ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সব রাজ্যে সতর্কতা জারি করেছে। বিশেষ করে তামিলনাডুসহ কয়েকটি রাজ্যে অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোমে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে বাড়তি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সফর বা সংস্পর্শের ইতিহাস রয়েছে—এমন রোগীদের নিপাহ সংক্রমণের সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে পরীক্ষা করতে হবে।

নিপাহ ভাইরাস একটি প্রাণীজ উৎস থেকে ছড়ানো ভাইরাস। এর প্রাকৃতিক বাহক ফলভুক বাদুড়, বিশেষ করে প্টেরোপাস প্রজাতির বাদুড়। সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শ, দূষিত খাবার গ্রহণ বা আক্রান্ত মানুষের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। ১৯৯৮–৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রথম বড় প্রাদুর্ভাবের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ভাইরাস হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, ক্লান্তি, গলাব্যথা ও কাশির মতো সাধারণ উপসর্গ দেখা দেয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই শ্বাসকষ্ট ও এনসেফালাইটিসে রূপ নিতে পারে। এতে খিঁচুনি, বিভ্রান্তি, অচেতনতা এমনকি কোমার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সমস্যায় ভোগেন।

এই ভাইরাসের মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি—৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। এখনো নিপাহ ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা অনুমোদিত টিকা নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও সহায়ক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিপাহ ভাইরাসকে অগ্রাধিকারভিত্তিক গবেষণার রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, বাদুড় বা শূকরের মতো প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, বাদুড়ে খাওয়া ফল না খাওয়া, ফল ভালোভাবে ধুয়ে বা খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া এবং খেজুরের রস ফুটিয়ে পান করা। আক্রান্ত এলাকায় উপসর্গযুক্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা ও নিয়মিত হাত ধোয়ার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

ভারতে নিপাহ ভাইরাস নতুন নয়। ২০০১ সাল থেকে দেশটিতে একাধিকবার এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা রাজ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। ২০১৮ সালের পর থেকে কেবল কেরালাতেই নয়বার নিপাহ প্রাদুর্ভাবের ঘটনা ঘটেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো সম্ভব। সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি আপাতত কম হলেও পরিস্থিতির ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখা হচ্ছে।

পরিস্থিতি আরও কীভাবে গড়ায়, তা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে ভারতসহ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো।

Related Articles

Back to top button