যৌথ বাহিনীর হেফাজতে বিএনপি নেতার মৃত্যু

অনলাইন ডেস্ক: চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে যৌথ বাহিনীর হেফাজতে পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলু (৫০) মারা গেছেন। আটকের পর নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের পরিবারের সদস্যরা। তবে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আটকের পর অসুস্থ হয়ে শামসুজ্জামান ডাবলু মারা গেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। গত সোমবার দিবাগত গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে।
এর আগে রাত ১১টার দিকে জীবননগর হাসপাতালের সামনে ঐ নেতার ওষুধের দোকানে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে যৌথ বাহিনী। এ সময় তার কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে আইএসপিআর। এদিকে শামসুজ্জামান ডাবলু নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ভোর থেকে বিএনপির বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা হাসপাতালের প্রধান ফটক অবরুদ্ধ করলে হাসপাতালের ভেতরে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা আটকা পড়েন।
এ সময় যৌথ বাহিনী হাসপাতালের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়। গেট দিয়ে ভেতরে রোগী ছাড়া কাওকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এ সময় পরিস্থিতি শান্ত করতে এসে গণপিটুনিতে মারাত্মক আহত হন জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোলাইমান সেখ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে চুয়াডাঙ্গা থেকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু ও বিএনপির অপর সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী শরীফউদ্দিন এসে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
দুপুর দেড়টার দিকে অবরুদ্ধ সেনা সদস্যদের উদ্ধার করা হয়। এরপর সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কড়া পাহারায় চুয়াডাঙ্গা হাসপাতাল মর্গে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শামসুজ্জামান ডাবলু জীবননগর বসুতিপাড়ার মৃত আতাহার আলী মাস্টারের ছেলে। উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক এই সভাপতি সম্প্রতি পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাড়ির সামনে হাসপাতাল গেটের একটি মার্কেটে তিনি হাফিজা ফার্মেসি নামের একটি ওষুধের দোকান পরিচালনা করেন। সোমবার রাতে দলের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি ওষুধের দোকানে আসেন। কিছু সময় পর যৌথ বাহিনী তাকে আটক করে পাশে বিএনপি অফিসের একটি রুমে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। এ সময় বাইরে থেকে ‘নির্যাতনের শিকার’ ডাবলুর চিত্কার ও কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। একপর্যায়ে রাত দেড়টার দিকে ডাবলু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে জীবননগর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মুহূর্তের মধ্যে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএনপির বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা রাতেই হাসপাতাল গেটে অবস্থান নিয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের ঘেরাও করেন। এ সময় জীবননগর-চুয়াডাঙ্গা সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করা হয়। ফলে ভোর থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত এ সড়কে কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। সকাল থেকেই শহরে বিএনপির পক্ষ থেকে মাইকিং করে হাসপাতাল গেটে নেতাকর্মীদের জড়ো হতে বলা হয়। বেলা ১১টার দিকে মৃতদেহ চুয়াডাঙ্গা মর্গে নিতে চাইলে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের বাধায় তা ব্যর্থ হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা সেনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি দাবি করে এ হত্যার সুষ্ঠু বিচারের প্রতিশ্রুতি চান। জীবননগর পৌর বিএনপির সভাপতি শাহজাহান কবির এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফের নেতৃত্বে শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে।
ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক: আইএসপিআর
শামসুজ্জামান ডাবলুর মৃত্যুর ঘটনায় আইএসপিআর গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত ১২ জানুয়ারি রাত ১১টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে যৌথ বাহিনী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসংলগ্ন একটি ফার্মেসি থেকে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে শামসুজ্জামান ওরফে ডাবলুকে আটক করা হয়। আটককৃত ব্যক্তির তথ্যের ভিত্তিতে টহল দল ঐ ফার্মেসি তল্লাশি করে একটি ৯ মিমি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। অভিযান শেষে আটককৃত ব্যক্তি হঠাত্ অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। আনুমানিক রাত ১২টা ২৫ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক ও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইতিমধ্যেই ঐ সেনাক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার ও অভিযানে অংশগ্রহণকারী সব সেনাসদস্যকে সেনানিবাসে প্রত্যাহার এবং সঠিক কারণ উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সেনা আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. এহেসানুল হক তন্ময়কে।
আসক ও এমএসএফের নিন্দা: হেফাজতে বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান ডাবলুর মৃত্যুর ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন -এমএসএফ। সংস্থা দুটি একই সঙ্গে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো পৃথক বৃিবতিতে তারা এই দাবি জানায়।




