নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে পোস্টাল ব্যালট

অনলাইন ডেস্ক: আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন পোস্টাল ব্যালটের নিবন্ধনকারী ভোটাররা। নানাভাবে রাজনৈতিক দলগুলো প্রবাসী ভোটারদের কাছে দ্বারস্থ হচ্ছেন। কেননা ইতিমধ্যে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন।
নিবন্ধনকারীদের মধ্যে দেশের ভেতরে রয়েছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪০ জন। আর বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী ভোটার রয়েছেন ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন। ৯৭টি আসনে ৫ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করেছেন। প্রতীকের পাশে টিক অথবা ক্রস দিয়ে ভোট দিতে পারবেন নিবন্ধিত ভোটাররা। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার পর থেকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়া শুরু হবে। ভোটের দিনই পোস্টাল ব্যালট পেপারও গণনা করা হবে বলে জানিয়েছে ইসি।
যেসব আসনে কম ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়, সেসব আসনে ফলাফল নির্ধারণে পোস্টাল ব্যালটের প্রভাব থাকবে বলে মনে করছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেছেন, ভোটের লড়াইয়ে কখনো কখনো একাধিক প্রার্থী সমান সমান ভোট পান; অনেক সময় ৫-১০ ভোটের ব্যবধানেও জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়।
সেখানে এবার হয়তো প্রবাসীদের ভোেট জয়-পরাজয় নির্ধারণের নিয়ামক (ফ্যাক্টর) হিসেবে কাজ করবে। গত ১৮ নভেম্বর উদ্বোধন হওয়া এই অ্যাপের মাধ্যমে বিশ্বের ১৪৮টি দেশ থেকে প্রবাসীরা তাদের সংশ্লিষ্ট দেশের মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করে নিবন্ধিত হতে পেরেছেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) পোস্টাল ভোেট বিডি নামের অ্যাপের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে আগ্রহী ব্যক্তিদের নিবন্ধন সম্পন্ন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশিরা এবং দেশে নিজ এলাকার বাইরে থাকা সরকারি কর্মচারী, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা এবং কারাগারের কয়েদিরা এই অ্যাপে নিবন্ধন করেন। একাধিকবার সময় বাড়িয়ে এই নিবন্ধন শেষ হয় ৫ জানুয়ারি।
কিছু আসনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিবন্ধনকারীরা সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারলে এসব আসনে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হতে পারে পোস্টাল ব্যালট। জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৮টিতে ১০ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। ৯৭টি আসনে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে। ১৮৫টি আসনে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ৫ হাজারের কম।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, মোট নিবন্ধনকারীর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪৩৪ জন। নারী ভোটার ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪৬ জন। প্রবাসী ভোটারের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন নিবন্ধন করেছেন। এছাড়া মালয়েশিয়ায় ৮৪ হাজার ২৯২ জন, কাতারে ৭৬ হাজার ১৩৯ জন ও ওমানে ৫৬ হাজার ২০৭ জন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন। দেশের ভেতরে ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোট’ ক্যাটাগরিতে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪০ জন। জেলাভিত্তিক নিবন্ধনে শীর্ষে রয়েছে কুমিল্লা-১ লাখ ১২ হাজার ৯০ জন। এরপর রয়েছে ঢাকা ১ লাখ ৮ হাজার ৭৫৫ জন ও চট্টগ্রাম ৯৫ হাজার ২৯৭ জন।
বেশ কয়েক জন প্রবাসী বলেছেন, কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন, তা প্রকাশ হওয়ার আশঙ্কায় প্রবাসীদের কেউ কেউ নিবন্ধন করেননি। তবে ইসি বলেছে, ভোটারদের শতভাগ সুরক্ষা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ব্যালট কখন পৌঁছাবে, সেই তথ্যও নিবন্ধনকারী ভোটাররা জানার সুযোগ পাবেন।
আসনভিত্তিক নিবন্ধন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে সর্বোচ্চ নিবন্ধন হয়েছে ফেনী-৩ আসনে, ১৬ হাজার ৯৩ জন। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১৪ হাজার ৩০১ জন, কুমিল্লা-১০ আসনে ১৩ হাজার ৯৭৭, নোয়াখালী-১ আসনে ১৩ হাজার ৬৫৮, নোয়াখালী-৩ আসনে ১২ হাজার ৮২৯, ফেনী-২ আসনে ১২ হাজার ৭৯৭, কুমিল্লা-১১ আসনে ১২ হাজার ৫৮৩, সিলেট-১ আসনে ১২ হাজার ৪৫৮, কুমিল্লা-৫ আসনে ১২ হাজার ৩৭৩, কুমিল্লা-৬ আসনে ১১ হাজার ৯৪৩, চাঁদপুর-৫ আসনে ১১ হাজার ৮৫২, নোয়াখালী-৫ আসনে ১১ হাজার ৬৭৫ ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। সবচেয়ে কম নিবন্ধন হয়েছে বাগেরহাট-৩ আসনে, ১ হাজার ৫৯৫ জন ভোটার। প্রবাসীদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেন। এরপর মালয়েশিয়া থেকে ৮৪ হাজার ২৯২ এবং কাতার থেকে ৭৬ হাজার ১৩৯ জন।
২১ জানুয়ারি থেকে পোস্টাল ব্যালটে ভোট শুরু: গত ২০ ডিসেম্বর থেকে পর্যায়ক্রমে প্রবাসী ভোটারদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু হয় এবং ৮ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার রাতে ব্যালট পাঠানোর কাজ সম্পন্ন করে ইসি। ইতিমধ্যে অনেক প্রবাসীর কাছে পোস্টাল ব্যালট পৌঁছেছে বলে জানান ইসির কর্মকর্তারা। আগামী ২১ জানুয়ারি ইসি প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার পর প্রবাসীরা ভোট দিয়ে ব্যালট পেপার রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানায় দ্রুত পাঠাবেন। দেশের ভেতরে ব্যালট পাঠানো এবং তা ফিরে আসার পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় সাত দিন সময় লাগতে পারে বলে ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পোস্টাল ব্যালটে ধানের শীষ-দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক: নিবন্ধিত ভোটারদের কাছে যে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে, সেখানে বিএনপির ধানের শীষ এবং জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যালটের প্রথম রোতে আছে দাঁড়িপাল্লা। অন্যদিকে সাত নং রোতে পড়েছে ধানের শীষ। এমনকি পোস্টাল ব্যালটে ধানের শীষ ভাঁজের নিচে পড়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৩০ অক্টোবর ১১৯টি প্রতীকের তালিকা প্রকাশ করেছিল ইসি। এই ১১৯টি প্রতীকের পাশাপাশি এবার পোস্টাল ব্যালটে ‘না ভোটের’ অপশন রাখা হয়েছে। যে ১১৯টি প্রতীক ব্যালটে রাখা হয়েছে, তার মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রতীক আছে ৫৯টি। বাকি প্রতীকগুলো স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীক। পোস্টাল ভোটিং প্রক্রিয়ায় প্রেরিত ব্যালট পেপারে সব প্রতীক মুদ্রিত থাকবে, যার প্রতিটি প্রতীকের পাশে ফাঁকা ঘর রয়েছে। পোস্টাল ব্যালটের একটি প্রতীকের বিপরীতে ক্রস অথবা ঠিক চিহ্ন দিয়ে ভোটদান করতে হবে।
পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রাপ্ত ভোট গণনা: ইসির পরিপত্রে বলা হয়েছে, ‘পাস্টাল ব্যালট পেপার গণনার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি গণনা কক্ষ প্রস্তুত করা হবে। পোস্টাল ভোট গণনার সময় প্রার্থী/নির্বাচনি এজেন্ট/প্রার্থীর প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, পর্যবেক্ষকগণ অন্যান্য কেন্দ্রের ন্যায় একই নীতিমালা অনুসরণে উপস্থিত থাকতে পারবেন। রিটার্নিং অফিসার পোস্টাল ভোট প্রদানের নিমিত্তে ডেভেলপকৃত সফটওয়্যারে লগইন করার পর সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রদত্ত ভোটের সামগ্রিক চিত্র দেখতে বা জানতে পারবেন।’
পোস্টাল ব্যালট খামে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ-ইসি: ডাকযোগে পাঠানো এই ব্যালট খামের ওপর কোনো কিছু লিখে রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণা চালানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এক্ষেত্রে এনআইডি কার্ড ব্লক এবং অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইসি। প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন বিষয়ক ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান এ তথ্য জানান। এ বিষয়ে ইসির এক বার্তায় বলা হয়, ‘পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপে নিবন্ধনকারী সব ভোটারকে অবহিত করা যাচ্ছে যে, আপনার ব্যালট পেপার শুধু আপনি সংগ্রহ করুন। ব্যালটের গোপনীয়তা রক্ষার্থে অন্য কোনো ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ব্যালট খামের ওপর কোনো কিছু লিখে রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণা চালানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ; নতুবা আপনার এনআইডি কার্ড ব্লক এবং অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।’
পোস্টাল ব্যালটে অভূতপূর্ব সাড়া-প্রেস সচিব: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রবাসী ভোটারদের ক্ষেত্রে গড় অংশগ্রহণের হার প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ। সেখানে বাংলাদেশ প্রথম বছরেই ৫ শতাংশের বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পেরেছে, যা নির্বাচন কমিশন ও সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।



