সাভারে ছয় খুন

সিরিয়াল কিলার সম্রাটের ঘটনায় আবার আলোচনায় রসু খাঁ, কোথায় আছেন তিনি

অনলাইন ডেস্ক: ঢাকার সাভারে ধারাবাহিকভাবে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মশিউর রহমান ওরফে সম্রাট (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর আলোচনায় ফিরে এসেছে আরেক ‘সিরিয়াল কিলার’ রসু খাঁর নাম। প্রায় ১৭ বছর আগে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচনায় এসেছিলেন রসু খাঁ। পুলিশ জানিয়েছিল, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তিনি একে একে ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন।

এর মধ্যে ১১ বছর আগে চাঁদপুরে এক পোশাকশ্রমিককে হত্যার দায়ে রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। ওই রায় পরবর্তীতে হাইকোর্টেও বহাল থাকে। তবে এখনো সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। বর্তমানে রসু খাঁ গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি সেলে বন্দি আছেন।

গত রোববার ঢাকার অদূরে সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও আশপাশ এলাকা থেকে ছয় মাসে ছয়টি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মশিউর রহমান ওরফে সম্রাটকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর রসু খাঁর পুরোনো ঘটনাগুলো নতুন করে আলোচনায় আসে।

চাঁদপুরে আলোচিত পারভীন হত্যা মামলায় দুই বছর আগে হাইকোর্ট রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। তবে ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁরা হলেন রসু খাঁর ভাগনে জহিরুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগী মো. ইউনুছ। এর আগে বিচারিক আদালত রসু খাঁসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। চাঁদপুরের আদালত ২০১৮ সালের ৬ মার্চ ওই রায় ঘোষণা করেন।

রসু খাঁর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মামুন মঙ্গলবার জানান, ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত রসু খাঁকে (৫২) কিছুদিন আগে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কাশিমপুরে স্থানান্তর করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে ফাঁসির আসামিদের নির্ধারিত সেলেই আছেন।

কারা কর্মকর্তা জানান, রসু খাঁ শারীরিকভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন। কারাগারে বন্দিদের বাইরে থেকে আনা খাবার গ্রহণের সুযোগ নেই। রসু খাঁকেও কারাগারের রান্না করা খাবারই খেতে হয়। তবে এখনো কোনো স্বজন তাঁকে দেখতে আসেননি।

এর আগে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক হালিমা খাতুন জানান, রসু খাঁসহ তিনজন যে ভবনে বন্দি ছিলেন, সেটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে কারণেই তাঁদের গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। নতুন ভবন নির্মাণ শেষ হলে তাঁদের আবার কুমিল্লা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, রসু খাঁকে মানসিকভাবে দৃঢ় বলেই মনে হয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রসু খাঁ ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তাঁর ভাগনেসহ তিনজনের বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করা হয়েছে।

২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর সদর উপজেলার সোবহানপুর গ্রামের ডাকাতিয়া নদীর পাড় থেকে শাহিদা আক্তার (১৯) নামের এক তরুণীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় চাঁদপুর মডেল থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক নজরুল ইসলাম অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

চাঁদপুর সদর উপজেলার মদনা গ্রামের বাসিন্দা রসু খাঁ ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর ওই এলাকায় মসজিদের ফ্যান চুরির মামলায় গ্রেপ্তার হন। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর কাছ থেকে একের পর এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের তথ্য বেরিয়ে আসে।

মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্র অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে রসু খাঁ পুলিশকে জানান, ২০০৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর খুলনার দৌলতপুরের কলমচর গ্রামের পোশাকশ্রমিক শাহিদা আক্তারকে (১৯) বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে চাঁদপুরে এনে ধর্ষণের পর হত্যা করেন তিনি।

পুলিশ আরও জানায়, ২০০৯ সালের ২০ জুলাই চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার হাসা খালের দক্ষিণ পাশে পারভীন নামের এক নারীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার কথাও তিনি স্বীকার করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে রসু খাঁ জানান, প্রেমের অভিনয় করে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তিনি মোট ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন। এর মধ্যে ফরিদগঞ্জে ছয়টি, চাঁদপুর সদরে চারটি এবং হাইমচরে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত সবাই ছিলেন ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক।

পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে রসু খাঁ বলেন, ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে তিনি ধীরে ধীরে একজন ক্রমিক খুনিতে পরিণত হন। তিনি আরও জানান, তাঁর লক্ষ্য ছিল ১০১টি হত্যাকাণ্ড ঘটানো।

রসু খাঁর উত্থান

চাঁদপুর সদর উপজেলার মদনা গ্রামের খাঁ বাড়ির বাসিন্দা রসু খাঁ ছোটবেলা থেকেই চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘ছিঁচকে চোর’ হিসেবে পরিচিতি পান। একপর্যায়ে তাঁর আচরণে বিরক্ত হয়ে গ্রামবাসী তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন।

এরপর তিনি গাজীপুরের টঙ্গীতে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি চুরি, ডাকাতি, গুন্ডামি, ভাড়াটে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

রসু খাঁ পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে জানান, টঙ্গীতে এক নারী পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে সম্পর্কের সময় ধরা পড়ে গণপিটুনির শিকার হওয়ার পর তিনি ১০১ নারী হত্যার শপথ নেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পন্ন করার পর তিনি একটি মাজারে গিয়ে তওবা করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। তবে এর আগেই মসজিদের ফ্যান চুরির ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি।

Related Articles

Back to top button