শতাধিক আসনে বিএনপির পথের কাঁটা বিদ্রোহী প্রার্থী


একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন না দেওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন সংগ্রহ 
দলের বিরুদ্ধে নির্বাচন করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি বিএনপির

অনলাইন ডেস্ক: শতাধিক আসনে বিএনপির পথের কাঁটা বিদ্রোহী প্রার্থী। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপির নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের বিধান না রাখায় এবার বিদ্রোহী হিসেবে লড়াই করার সুযোগ পাচ্ছেন বিভিন্ন স্তরের বিএনপির নেতারা। অনেক আসনে স্বতন্ত্র এবং দলীয়ভাবে মনোনয়ন সংগ্রহ করছেন প্রার্থীরা। যদিও বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে বিএনপি। এ বিষয়ে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটে লড়বেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বিএনপি।’

সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত রাতের ভোটের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। সেবার বিদ্রোহী ঠেকাতে প্রতি আসনে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল দলটি। কিন্তু এবার একক প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন দলটির নেতারা। নির্বাচনি আইনে একটি আসন থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের সুযোগ আছে রাজনৈতিক দলগুলোর। কিন্তু সেই সুযোগ এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি বিএনপি। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল একটি এলাকায় একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে পারবে। সেক্ষেত্রে দলের সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত লিখিত পত্রের মাধ্যমে আগামী ২০ জানুয়ারি বিকাল ৫টার মধ্যে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম রিটার্নিং অফিসারকে জানাতে হবে। সেক্ষেত্রে অন্যান্য মনোনীত প্রার্থীর প্রার্থিতা স্থগিত বলে গণ্য হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি যে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে, তা ঘিরে তৃণমূলে ক্ষোভ ও বিভক্তি লক্ষ করা যায়। অনেক জায়গায় মনোনয়নবঞ্চিতদের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। তালিকা ঘোষণার পর দলের ভেতর অসন্তোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন। তৃণমূল নেতাদের মতে, খুব দ্রুত এসব কোন্দল নিরসন না হলে নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব পড়তে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, বিএনপিকে এককভাবে সরকার গঠন করতে হলে এখনই শক্তিশালী দলীয় ঐক্য ও মাঠের বিরোধ নিষ্পত্তি করা জরুরি।

পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসন থেকে দলীয় এবং স্বতন্ত্র দুই ভাবেই মনোনয়ন সংগ্রহ করবেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘৪৬ বছর আমার আসন থেকে বিএনপির কেউ প্রতিনিধিত্ব করেনি। আমি নির্বাচন না করলে দলের অস্তিত্ব সংকটে। ২০১৮ সালে গোলাম মাওলা রনিকে মনোনয়ন দিয়ে দলের প্রচণ্ড ক্ষতি করা হয়। এ জন্য এবার স্বতন্ত্র এবং দলীয়ভাবে মনোনয়ন সংগ্রহ করব। দল মনোনয়ন দিলে ভালো, না দিলে স্বতন্ত্র নির্বাচন করব।’ সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনী-কালীগঞ্জ) আসনে ২০১৮ সালে মনোনয়ন পেয়েছিলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. শহিদুল আলম। এবার এই আসন থেকে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দিন। তাকে মনোনয়ন না দিলে তিনিও স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন। শহিদুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আসনটি নিয়ে কাজ করেছি। দল মনোনয়ন না দিলেও নেতাকর্মীদের চাওয়া অনুযায়ী স্বতন্ত্র নির্বাচন করব। ’

২০১৮ সালে ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসন থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। এখনো পর্যন্ত ঐ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়নি। নির্বাচন করার বিষয়ে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি প্রত্যাশা করি দল আমাকে মনোনয়ন দেবে। ইতিমধ্যে নেতাকর্মীরা আমার পক্ষে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন।’

নোয়াখালী-২ (সেনবাগ-সোনাইমুড়ী আংশিক) আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক। এই আসন থেকে তার বিপক্ষে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী মফিজুর রহমান।

নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবীরহাট) আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন ফখরুল ইসলাম। এতে ক্ষুব্ধ মনোনয়নবঞ্চিত বজলুল করীম আবেদের সমর্থকরা। এই আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচনীয় ফরম সংগ্রহ করেছেন বিএনপির প্রয়াত স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসীমউদদীন মওদুদ।

মাগুরা-২ (শালিখা-মোহাম্মদপুর) আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল। সম্প্রতি শালিখার আড়পাড়ায় আইডিয়াল হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত জনসভায় নিতাই রায় চৌধুরীর মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে আয়োজিত সমাবেশে এই ঘোষণা দেন তিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পাননি সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা। আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন নাজমুল মোস্তফা আমিন। এই আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান।

কুমিল্লা-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়া। সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অনড় রয়েছেন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক এপিএস এম এ মতিন। কুমিল্লা-৭ আসনে মনোনয়নবঞ্চিত উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আতিকুল আলম শাওন স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। সুনামগঞ্জ (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুলের বিপক্ষে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। টাঙ্গাইল-১ আসনে বিএনপি মনোনীত ফকির মাহবুব আনাম স্বপনের বিপরীতে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলী। টাঙ্গাইল-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ওবায়দুল হক নাসির। ঐ আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন সাবেক এমপি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লুত্ফুর রহমান খান আজাদ। টাঙ্গাইল-৫ আসনে বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দীন টুকুকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এই আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল। টাঙ্গাইল-৭ আসন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের বিপরীতে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক সাইদুর রহমান সাঈদ সোহরাব।

ময়মনসিংহ-৯ আসনে এখনো পর্যন্ত বিএনপির পাঁচ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন ইয়াসের খান জয়। তবে নেতাকর্মীরা বলছেন, যে পাঁচ জন মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন তার মধ্য থেকে মামুন বিন আবদুল মান্নানকে মনোনয়ন দেওয়া হলে বাকিরা নির্বাচন করবেন না। ঠাকুরগাঁও-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন ডা. আবদুস সালাম। দলটির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন সাবেক এমপি জুলফিকার মর্তুজা চৌধুুরী। হবিগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি মনোনীত ড. রেজা কিবরিয়ার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন সাবেক এমপি শেখ সুজাত মিয়া। সিলেট-৫ আসনে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি নেতা মামুনুর রশিদ। গোপালগঞ্জ-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম সিরাজুল ইসলাম সিরাজ। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে ডা. এ কে এম বাবরকে।

Related Articles

Back to top button