চির তরুণ ইত্তেফাকের ৭৩ বছরে পদার্পণ

অনলাইন ডেস্ক: স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পূর্ণ হলো এই বছর; আর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ৭৩ বছর পূর্তি। দৈনিক ইত্তেফাকেরও ৭৩ বছরে পদার্পণ আজ। অতীব অভাবনীয় তাৎপর্যের এই কাকতাল। দুনিয়া কাঁপানো মাতৃভাষা আন্দোলনের লাল ফেব্রুয়ারির রক্তে রাঙানো পটভূমি মোছেনি তখনো; পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ নির্বাচনকে সমুখে রেখে ঘোর ক্রান্তিকাল ঘিরে রেখেছিল। সেই টালমাটাল যুগসন্ধিক্ষণে আত্মপ্রকাশ ঘটে ইত্তেফাকের। ১৯৫৩ সনের ২৪ ডিসেম্বর প্রথম প্রকাশ। দৈনিক ইত্তেফাক বহুবিধ ঝড়-ঝঞ্ঝা-প্রতিকূলতা এবং আনন্দ-সফলতায় বিগত ৭২ বছরের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ ৭৩ বছরে প্রবেশ করল।
একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে দৈনিক ইত্তেফাক অভিযাত্রা সূচনা করেছিল। এটা ছিল একটি রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র। সেই সময়ে ইত্তেফাকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া—তারা ছিলেন একই সূত্রে গাঁথা। বড় দাগে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অবদানও অনস্বীকার্য। প্রকাশের পর অচিরেই এই পত্রিকাটি নির্ভীক ও আপসহীন তীব্র দ্রোহ নিয়ে দেশের স্বাধীকার অর্জনের তাক-নিশানায় পশ্চিম পাকিস্তানের ভিতে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। প্রাক-স্বাধীনতাযুগে এই ‘খবরের কাগজ’ ছিল জাতীয়তাবাদের উদ্গাতা, পশ্চিমের বৈষম্য-ভ্রুকুটির বিরুদ্ধে সংশপ্তক, স্বাধীনতা আন্দোলনের ভ্যানগার্ড। দৈনিক ইত্তেফাকের বারুদভরা রিপোর্ট আর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জাতিরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের প্রতি দৃঢ়ব্রত অনমনীয়তা, ক্ষুরধার লেখনী ‘মুসলিম লীগ দলে নাভিশ্বাস’ সৃষ্টি করেছিল। লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল মুসলিম লীগ সরকারকে। আজকের তিয়াত্তর বছরের পদযাত্রার ইত্তেফাক সেই উনিশ শ উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক ছিল। ছিল মুক্তিযুদ্ধের তূর্যবাদক; প্রতিরোধের ভাষাদুর্গ। বৈরী ভাবাপন্ন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইত্তেফাকের কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। দমন-পীড়ন—সব ধরনের ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে ইত্তেফাক তার ভাষ্য আপামর মানুষের দ্বারে পৌঁছে দেয়। দিশাহীন জাতিকে দিকনির্দেশনা দিতে দৈনিক ইত্তেফাক যে ভূমিকা রেখেছে, তা শুধু এই দেশেরই নয়, বিশ্বের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ইত্তেফাক কেবল একটি দৈনিক পত্রিকাই ছিল না, বরং ছিল গণতান্ত্রিক চেতনাকে উজ্জীবিত করার একটি প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ইত্তেফাক দাঁড়িয়েছে এই বাংলাদেশ এবং তার মানুষদের সার্বিক উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার পক্ষে, অন্তরঙ্গ প্রকরণে।
অনেকাংশে পক্ষপাতহীন মতামত, গঠনমূলক সমালোচনা, অদম্য সাহস আর আপসহীন মনোভাব—এ হলো মাত্র কয়েকটা দিক, যা ইত্তেফাককে করে তুলেছে ‘বাংলাদেশের ভাষা’, গণমানুষের মুখপাত্র। আপন কীর্তিমালার রথে ইতিহাসের মহাসড়কে ইত্তেফাক নিজেকে দাঁড় করিয়ে অতঃপর; রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ মর্যাদা অর্জন করে নিয়েছিল।
জীবনযাপনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতকে প্রতি মুহূর্তে ধরতে চেয়েছে মহিরুহ ইত্তেফাক। প্রাত্যহিকের অনুপ্রাস-অনুষঙ্গকে খুঁড়ে-ফুঁড়ে তুলে ধরছে ব্রডশিটের চৌহদ্দিতে। চেষ্টা করছে যুক্তি-তর্কের দুই বিপ্রতীপ অবস্থানে দাঁড়িয়ে অবিরত নৈর্ব্যক্তিক প্রতিযুক্তি নির্মাণে উচ্চকিত থাকার। দৈনিক ইত্তেফাক অখণ্ড সাত দশক ধরে রাষ্ট্র-সমাজ-নিত্য জীবনযাত্রার সদন-অন্দরের দ্রুত-পরিবর্তনশীল, স্বতঃ-অনিশ্চিত এবং ক্রম-অপস্রিয়মাণ নানা পরিসরে ঘটে চলা খবরগুলো গণমানুষের হয়ে সমুখে তুলে আনছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবশালী ও কুহেলিকাপূর্ণ পরিকল্পিত ভাইরাল আবেগ, ছদ্ম-ক্ষমতায়ন ও ছদ্ম-অ্যানার্কিজম আর নিত্য নতুন বহুব্রীহি পত্রপত্রিকা, অনলাইন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ডিজিটাল পোর্টালের এই ‘মেটাভার্স’ সময়েও ৭৩ বছরে দাঁড়িয়ে নিজের ধাবমান অক্ষয়-অব্যয় চিরতারুণ্য দিয়ে সময়কে অধিকার করে রেখেছে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম ‘চিরতরুণ’ ইত্তেফাক। নিয়ত পরিবর্তনশীল-এর নান্দনিক প্রচ্ছদপট, আঙ্গিক, অবয়ব, ভাষা অহরহ পাঠকের চাহিদাকে ধারণ করছে। তাই তো এক প্রজন্মের হাত থেকে আরেক প্রজন্মকে বিমুগ্ধ পাঠক, শুভানুধ্যায়ী বানিয়ে চলেছে ঐতিহ্যবাহী আধুনিক দৈনিক ইত্তেফাক। প্রিয় ইত্তেফাকের জন্মদিন শুভ হোক।



