জুলাই শহীদ আসিফের বাবা

‘ছেলে তো আর ফিরবে না, অন্তত বিচারটা চাই’

অনলাইন ডেস্ক: দুই বছর কেটে গেছে। তবু ঘরের এক কোণে যত্ন করে রেখে দেওয়া রক্তমাখা শার্টটি দেখলেই ভেঙে পড়েন বাবা আমজাদ হোসেন। শার্টটি যেন প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়, সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় যাওয়া ছেলে আসিফ আর কোনো দিন ফিরবে না।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত আসিফুর রহমান আসিফের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ—দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তারা পাননি হত্যার বিচার। সময়ের সঙ্গে শোকের তীব্রতা কিছুটা কমলেও ন্যায়বিচারের অপেক্ষা আজও শেষ হয়নি। পরিবারের একটাই প্রশ্ন, কবে মিলবে সেই কাঙ্ক্ষিত বিচার?

গতকাল রোববার (১৯ জুলাই) ছিল আসিফুর রহমান আসিফের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কেরেঙ্গাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন ও ফজিলা খাতুন দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকায় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আসিফ। তার মৃত্যুর দুই বছর পরও পরিবারের দাবি, দ্রুত যাতে হত্যার বিচার নিশ্চিত হয়।

দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে ছেলেকে স্মরণ করতে গিয়ে আজও শোকাহত পরিবার। তবে শোকের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিচার না পাওয়ার বেদনা। পরিবারের দাবি, দীর্ঘ দুই বছর পার হলেও এখনো হত্যার বিচার পাননি তারা।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জন্য বাড়ি থেকে বের হন আসিফ। ওই সময় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনের মধ্যেই পুলিশের ছোড়া একটি গুলি এসে তার মাথায় আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে মিরপুরের আলোক হাসপাতালে নিয়ে যায়।

আসিফের বাবা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ফোনে ছেলের দুর্ঘটনার খবর শুনে দ্রুত হাসপাতালে যাই। গিয়ে দেখি, আমার ছেলের মাথার ডান পাশে গুলি লেগেছে।’ পরে তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রিকশাযোগে জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘সেদিনের কথা মনে হলে এখনো বুকটা ফেটে যায়। আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না।’

পরবর্তীতে আসিফের মরদেহ গ্রামের বাড়ি কেরেঙ্গাপাড়ায় নিয়ে এসে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে সরকার পরিবর্তনের পর একই বছরের ২ নভেম্বর ঢাকার একটি আদালতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২০১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন আসিফের বাবা আমজাদ হোসেন।

মামলার কিছুদিন পর তদন্তের স্বার্থে কবরস্থান থেকে আসিফের মরদেহ উত্তোলন করে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয় বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।

ঢাকার আলোচিত জুলাই ছাত্র আসিফ হত্যা মামলার তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামি থাকায় চার্জশিট দিতে সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঢাকা মেট্রো উত্তরের সিআইডির নিরস্ত্র পরিদর্শক আলতাব হোসেন বলেন, আসিফ হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ মামলায় ২০১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। আসামির সংখ্যা বেশি হওয়ায় তদন্ত সম্পন্ন করে চার্জশিট দিতে কিছুটা সময় লাগছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা দ্রুত তদন্ত কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি। তদন্ত শেষে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে খুব শিগগিরই চার্জশিট দাখিল করা হবে। বিচারিক কার্যক্রম আদালতের এখতিয়ার অনুযায়ী এগিয়ে চলছে।

আসিফের মা ফজিলা খাতুন বলেন, দুই ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে আসিফ ছিল আমার দ্বিতীয় সন্তান। সংসারের কষ্ট দেখে সে ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। মাসে ১৩ হাজার টাকা বেতনে আমাদের সংসারে সাহায্য করত। এখন সেই ছেলেটা আর নেই। ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। পরিবারের অন্য সদস্যরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

আসিফের বাবা আমজাদ হোসেন বলেন, দুই বছর হয়ে গেল ছেলে মারা গেছে। ছেলে তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু বিচারের আশায় মামলা করেছিলাম। আজও সেই বিচার পাইনি।

ছেলের রক্তমাখা শার্ট দেখিয়ে তিনি বলেন, এটাই আমার ছেলের শেষ স্মৃতি। কিছু আর্থিক সহায়তা পেয়েছি, সম্মানও পেয়েছি কিন্তু বিচার তো পাইনি।

তিনি আরও বলেন, আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত বিচার চাই। যেন আর কোনো বাবা-মাকে এভাবে সন্তানের জন্য কাঁদতে না হয়।

এদিকে, স্থানীয়দের মতে, আসিফ ছিল ভদ্র ও পরিশ্রমী একজন তরুণ। পরিবারের হাল ধরতে অল্প বয়সেই কাজ শুরু করেছিল সে। তার অকাল মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবারের পক্ষ থেকে তার কবর জিয়ারত ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সেখানে স্বজন ও এলাকাবাসী অংশ নেন এবং আসিফের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

Related Articles

Back to top button