ষোল বছরের শ্রম, ১৭ মাসেই তছনছ

অনলাইন ডেস্ক: তিল তিল করে গড়ে তোলা হয়েছিল বাংলাদেশের নারী জাতীয় ফুটবল দল। প্রায় ১৬ বছর শ্রম দিয়ে গড়ে তোলা বাংলাদেশ নারী জাতীয় ফুটবল দল যেন ১৭ মাসেই তছনছ হয়ে গেছে। উপমহাদেশের নারী ফুটবলে উন্নয়নের পথে দৌড়াতে থাকা বাংলাদেশ দলটা নিয়ে এখন মানুষের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। গত ১৮টা মাস একের পর এক ব্যর্থতায় নারী ফুটবল দলটা এখন পথে পথে হোঁচট খাচ্ছে। কোনো টুর্নামেন্টে গেলেই নারী দল ব্যর্থ হচ্ছে। পথ হারাচ্ছে। ১৬ বছরের যত্নে গড়া দল খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে যাচ্ছে। 

এদেশের নারী ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের আপামর সাধারণ মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। সেই স্বপ্নটা খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই ভাঙতে শুরু করেছে। দুইবার সাফজয়ী বাংলাদেশ নারী দল এবার হ্যাটট্রিক শিরোপা জয় করতে পারেনি। এশিয়া কাপে বাজেভাবে গোল হজম করেছে, সাফে গিয়ে যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্স করে মাথা নিচু করে দেশে ফিরছে আজ।

স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হওয়া নারী ফুটবল দলটা ছিল একটা শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। সেই দলটা এখন ভঙ্গুর অবস্থায়। গত ১৭ মাসে নারী ফুটবল দলটাকে নিয়ে যেভাবে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে, টানা হেঁচড়া করায় যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করতে কতো বছর লাগবে সেটা সাফের ফাইনালে বুঝিয়ে দিয়েছে ভারত। গ্রুপ ম্যাচে ৩-০, ফাইনালে ৩-১ গোলে বাংলাদেশকে হারিয়েছে ভারত। দুই ম্যাচে ৭ গোল হজম। টপ স্কোরার, বেস্ট স্কোরার, বেস্ট গোলকিপার, ফেয়ার প্লে ট্রফি-সবই তো গত দুই সাফে বাংলাদেশের দখলে ছিল। এখন সব হারিয়ে শূন্য সাবিনাদের সেই দল। 

হবেই না কেন, সাফে হ্যাটট্রিক শিরোপা নিয়ে কী দীর্ঘ মেয়াদি কোনো পরিকল্পনা ছিল? দলটা ভেঙে চুরমার করা হয়েছে। তিল তিল করে গড়া দলের ভালো ভালো ফুটবলারকে ক্যাম্প থেকে বের করে দিয়েছেন কোচ। ইংলিশ কোচ পিটারের সঙ্গে খেলোয়াড়দের দ্বন্দ্ব, পুরো দেশবাসী দেখল। সেই দ্বন্দ্বে জয়ী হলেন কোচ। নতুন দায়িত্ব পাওয়া বাফুফের নীতি নির্ধারকরা সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে সাবিনা-সানজিদা-মাসুরাদেরকে ফিরিয়ে এনে দেশের নারী ফুটবলকে বাঁচানোর মুন্সিয়ানা দেখাতে পারলেন না। ডুবল দেশ, কিন্তু পিটার তার ইগো ধরে রাখলেন। আর বাফুফের নীতি নির্ধারকরাও তার ইগোর কাছে হেরে গেলেন, সংকট মুহূর্তে সাংগঠনিক মেধাভিত্তিক লড়াই করে দেশের ভালোটা পিটারকে বুঝাতে পারলেন না। 

পিটার বললেন চলবে, আমরা এই দল নিয়েই এশিয়া কাপে উঠতে পারবো। তিনি যে একটা রেডি দল পেয়েছেন সেটা বুঝেই এশিয়া কাপের বাছাইয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। বুঝেনি বাফুফে। একটা ঘুরন্ত ফ্যানের সুইচ বন্ধ করলেও সেটা ঘুরতে ঘুরতেই থামবে-এটাই স্বাভাবিক। ঋতুপর্নাদেরকে থামতে ১৭ মাস লাগল। এখন পিটার বলছেন তিনি অন্য কোথায় কাজ করবেন।

এশিয়া কাপে যাওয়ার আগে ঋতুপর্নারা বিজ্ঞাপনের কাজে মনোযোগ দিয়েছেন। বাফুফের নীতি নির্ধারকরা আফঈদা-ঋতুপর্নাদেরকে পাঠালেন বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে। এশিয়া কাপের খেলার আগে ঢাকা স্টেডিয়ামে মোবাইল ফোনের শুটিং, সাফে যাওয়ার আগে কমলাপুর স্টেডিয়ামে শুটিং। খেলায় মন থাকবে কীভাবে। ফিফার অনুদান পেতে তড়িঘড়ি করে নামকাওয়াস্তে লিগ আয়োজন। একদিনে পাঁচ ম্যাচ, খেলোয়াড়রা পড়েছেন ইনজুরিতে। এশিয়া কাপে গিয়েছিলেন ইনজুরি নিয়ে, সাফেও তাই।

এদেশের ফুটবল ছিল পুরুষ কেন্দ্রিক। পেশাদারী কাঠামোয় নারী দল গড়া নিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলে কখনো স্বপ্ন ছিল না। কিন্তু বাফুফে পরিকল্পনা করল বিভিন্ন ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলা গ্রামের ছোট ছোট বয়সের মেয়েদেরকে নিয়ে বাফুফে ভবনে আবাসিক ক্যাম্প হবে। তখন বলা হতো অহেতুক অর্থের অপচয়। সেই কানকথা বাদ দিয়ে একলা চলো নীতিতে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনায় নীরবে নিঃশ্বব্দে প্রশিক্ষণ চলছিল বাফুফে ভবনের চারতলায়। গ্রামের বাড়ি থেকে ধরে এনে ক্যাম্পে রেখে প্রশিক্ষণ দেওয়া পড়ালেখা শেখার উদ্যোগ না নেওয়া হলে ততদিনে সবারই বিয়ে হয়ে যেত। 

উন্নতির জন্য দেশীয় কোচের সঙ্গে বিদেশি কোচিং স্টাফ যোগ করা হয়েছিল যেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠতে পারেন ফুটবলাররা। সেই ভাবনায় নারী দলকে গড়ে তোলার পরিকল্পনার মূল ছকটা এঁকে দিতেন বাফুফের তখনকার সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন। মাহফুজা আক্তার কিরণও দেশের কথা মাথায় রেখে অক্ষরে অক্ষরে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। কিন্তু ১৭ মাসে সেই ধারাবাহিকতা রাখা গেল না। ইংলিশ কোচ পিটারের ভুল পরিকল্পনা, আর সেগুলো আমলে না নেওয়ার খেসারত দিতে হলো হ্যাটট্রিক শিরোপা হারিয়ে। ষোল বছরের শ্রম ১৭ মাসেই তছনছ।

Related Articles

Back to top button