চীন-পাকিস্তান সীমান্ত শক্তিশালী করতে শতাধিক রাফাল কিনছে ভারত

অনলাইন ডেস্ক: নিজেদের বিমানবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি এবং স্কোয়াড্রন ঘাটতি পূরণে ফ্রান্স থেকে আরও ১১৪টি সর্বাধুনিক রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার মেগা পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে ভারত। নয়াদিল্লি ইতিমধ্যেই এই কৌশলগত যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে ফ্রান্সের সরকারের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ফ্রান্সে গেছেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল অমর প্রীত সিং। 

প্রস্তাবিত এই বিশাল সামরিক চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে ভারতের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী মিলিয়ে মোট রাফাল যুদ্ধবিমানের বহর বেড়ে দাঁড়াবে ১৭৬টিতে, যা চীন ও পাকিস্তান সীমান্তে ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তিকে বহুগুণ শক্তিশালী করবে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-র এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পাঠানো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে এখন ফ্রান্সের সরকার যুদ্ধবিমানের মোট মূল্য, দাসো অ্যাভিয়েশনের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি লজিস্টিক বা প্রযুক্তিগত সহায়তা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ফ্রান্সের কাছ থেকে এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত জবাব পাওয়ার আশা করছে নয়াদিল্লি এবং এরপরই দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক দরকষাকষি শুরু হবে। 

প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তাদের দৃঢ় ধারণা, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ঠিকঠাক এগোলে আগামী এক বছরের মধ্যেই এই মেগা চুক্তিটি সম্পূর্ণ চূড়ান্ত হতে পারে। এই সামরিক প্রজেক্টটি সম্পূর্ণ সরকার-টু-সরকার বা জি-টু-জি পদ্ধতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং চলতি জুনের মাঝামাঝি সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য ফ্রান্স সফরে এই চুক্তিটি অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে।

ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল অমর প্রীত সিংয়ের বর্তমান ফ্রান্স সফরকে কেবল প্রথামাফিক আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে দেখছেন না সামরিক বিশ্লেষকেরা। সফরকালে তিনি ফ্রান্সের শীর্ষ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে মিলিত হবেন, যার মধ্যে রাফাল যুদ্ধবিমানের মূল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান দাসো অ্যাভিয়েশন এবং মিটিওর ও স্ক্যাল্পের মতো অত্যন্ত উন্নত ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুতকারী ফরাসি ডিফেন্স জায়ান্ট এমবিডিএ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

এই আলোচনার মূল লক্ষ্য শুধু যুদ্ধবিমান কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভারতের মাটিতে বিমানগুলোর যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং ভারতীয় নিজস্ব অস্ত্র ব্যবস্থার সফল সংযোজন নিয়ে গভীর আলোচনা হতে পারে।

বর্তমানে ভারতীয় বিমানবাহিনীর অনুমোদিত বা প্রমিত স্কোয়াড্রনের সংখ্যা ৪২টি হওয়া আবশ্যক হলেও রাশিয়ার তৈরি মিগ-২১ এর মতো পুরোনো যুদ্ধবিমানগুলো পর্যায়ক্রমে অবসরে যাওয়ায় এই সংখ্যা বর্তমানে মাত্র ২৯টিতে নেমে এসেছে। বিমানবাহিনীর এই মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘাটতি মেটাতেই মূলত ১১৪টি নতুন বহুমুখী ফাইটার জেট সংগ্রহের মহাপরিকল্পনা করেছে দেশটির সরকার। এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় রাফালকেই সবচেয়ে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছে দিল্লি। প্রস্তাবিত চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ১১৪টি বিমানের মধ্যে মাত্র ২০টি সরাসরি ফ্রান্স থেকে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় সরবরাহ করা হবে এবং বাকি ৯৪টি যুদ্ধবিমান ভারতের মাটিতেই উৎপাদন করা হবে। এই উদ্দেশ্যে দাসো অ্যাভিয়েশন ভারতের যেকোনো একটি শীর্ষস্থানীয় দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্ব বা কো-প্রোডাকশন চুক্তি করতে পারে।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই মেগা প্রকল্পে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ সম্পূর্ণ স্থানীয় বা দেশীয় উপাদান ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা সুনির্দিষ্ট করে নির্ধারণ করেছে, যা বিমানগুলোতে ভারতের নিজস্ব ডিআরডিও প্রযুক্তির রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজনে সাহায্য করবে। এটি ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচির জন্য একটি ঐতিহাসিক বড় পদক্ষেপ হতে চলেছে। 

উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যে হওয়া প্রথম চুক্তির আওতায় কেনা ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমানের সবগুলোই ইতিমধ্যে ভারতের আম্বালা ও হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে সম্পূর্ণ সক্রিয় অবস্থায় মোতায়েন রয়েছে। বর্তমানের এই ৩৬টি রাফাল এবং নৌবাহিনীর জন্য আগের স্বাক্ষরিত চুক্তির আরও ২৬টি রাফাল-এম এর পাশাপাশি নতুন ১১৪টি ফাইটার জেট যুক্ত হলে ভারতের মোট রাফাল সংখ্যা ১৭৬টিতে পৌঁছাবে, যা দক্ষিণ এশিয়ার আকাশসীমায় দিল্লির একক সামরিক আধিপত্য ধরে রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

সূত্র: এনডিটিভি

Related Articles

Back to top button