অস্তিত্ব সংকটে চামড়াশিল্প
চামড়া খাতের উন্নয়নে আগামী জুলাইয়ে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী
রপ্তানির জন্য লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার বাজারকে উন্মুক্ত করা দরকার :ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশ কাঁচা চামড়ার বড় উত্সস্থল হলেও রীতিমতো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এ শিল্প। টানা গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। কোরবানির ঈদের আগে সরকার লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দর নির্ধারণ করে দিলেও ধস ঠেকানো যায়নি। নির্ধারিত দরের অনেক কমে গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে। এমনকি দেশের অনেক জায়গায় বিক্রেতারা চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু কেন এ অবস্থা?
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নানা কারণে দেশে চামড়ার বাজারের এ বিপর্যয়। এর মধ্যে বড় কারণগুলো হলো: পরিবেশগত সনদ না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার হারানো, আড়তদার ও ট্যানারি শিল্প মালিকদের বড় সিন্ডিকেট, বাজারের সাথে সামঞ্জস্যহীনভাবে কাঁচা চামড়ার দর নির্ধারণ, চীনের বাজারের উপর নির্ভরতা ইত্যাদি। তারা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত চামড়া রপ্তানি করা যাচ্ছে না। আবার দেশের যেসব জুতা কারখানাগুলো বিদেশে জুতা রপ্তানি করে তারাও পরিবেশগত অনুমোদন না থাকায় এসব চামড়া কিনতে পারছে না। কারণ, এসব চামড়া দিয়ে জুতা বানালে বিদেশি আমদানিকারকরা তা নেবে না। ফলে তারা শুধু দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য যতটুকু চামড়া প্রয়োজন ততটুকু কিনছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) -এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ প্রসঙ্গে গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের অভ্যন্তরীণ চামড়ার যে বাজার আছে, তা সম্প্রসারণ হচ্ছে না। কারণ, এ বাজারের যারা ক্রেতা তাদের সংখ্যা বেশি না। যারা আছেন, তারা আবার বড় আকারে চামড়া কিনছেন না। তিনি বলেন, এ খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকের প্রচুর ঋণ আছে। আবার কারো ব্যবসা কমে গেছে। সবমিলিয়ে, মূল ক্রেতার সংখ্যা খুব কম। কিন্তু সরকার দেশের বাজারের কথা বলে কাঁচা চামড়ার রপ্তানিকে আটকে রাখছে। তিনি বলেন, দেশে যারা জুতা রপ্তানি করছেন তারা আবার আমদানি করা চামড়া ব্যবহার করছেন। তাহলে এ অবস্থায় আমাদের কি করতে হবে? সিপিডির এই গবেষণা পরিচালক বলেন, আমাদের লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার বাজারটাকে রপ্তানির জন্য উন্মুক্ত করা দরকার। যাতে যে কেউ যে কোনো সময় কাঁচা চামড়া রপ্তানি করতে পারেন। এছাড়া, দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এসব করলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি বছরই চামড়া নিয়ে প্রায় একই রকম সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। চামড়া শিল্পের সমস্যাটা কোথায় তারা হয়তো অনুধাবন করার চেষ্ট করছেন না। সেই আগ্রহ হয়তো নেই।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশে গত এক দশকে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে। এক দশক আগেও কোরবানির পশুর প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়ার (গরু) সরকার নির্ধারিত দর ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। যা এ বছর ৬৫ টাকায় নেমে আসে। যদিও এবার ঈদে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে নির্ধারিত দরের অনেক কমে। সাধারণত বড় আকারের একটি গরুর চামড়া ৩১ থেকে ৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২১ থেকে ৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া ১৬ থেকে ২০ বর্গফুটের হয়। সে হিসাবে লবণযুক্ত ছোট আকারের এক পিস চামড়ার দাম হবে প্রায় এক হাজার টাকা। আর মাঝারি আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়া ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত একটি চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে লবণ ও শ্রমিক বাবদ খরচ পড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। এই টাকা বর্তমানের কাঁচা চামড়ার দামের সঙ্গে যুক্ত করলেও সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক কম দামে এবার চামড়া বিক্রি হচ্ছে। অথচ প্রতি বছরই কোরবানিকৃত পশুর পরিমাণ বেড়েছে। তবে চামড়ার দাম এত কম হওয়া প্রসঙ্গে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা আড়তদার ও ট্যানারি শিল্প মালিকদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন, দেশে চামড়ার ভালো এক জোড়া জুতার দাম কয়েক হাজার টাকা। অথচ কাঁচা চামড়ার দাম নেই। এটা ‘সিন্ডিকেটের বাজার’ ছাড়া আর কিছুই না। কোরবানির ঈদের দিন রাজধানীর উত্তরা এলাকায় চামড়ার মৌসুমি ব্যবসায়ী স্বপন আহমেদ বলেন, তিনি এবার ৪০০ থেকে ৬৫০ টাকার মধ্যে চামড়া কিনেছিলেন। এরমধ্যে বেশির ভাগই কিনেছেন ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে। চামড়ার এই দর গত বছরের চেয়ে কম বলে তিনি জানান। এত কম দামে চামড়া কিনেও তিনি লাভ করতে পারেননি। ট্যানারি শিল্প মালিকরা বলেছেন, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় বাংলাদেশের চামড়া আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মানতে পারছে না। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উন্নত বাজারে দেশের চামড়া রপ্তানি করা যাচ্ছে না। চামড়ার বাজারে ধস হওয়ার এটি একটি বড় কারণ। যদিও এ খাতের বড় উদ্যোক্তারা প্রতি বছরই চামড়া শিল্পে বড় বিনিয়োগ করছেন।
চামড়ার দাম কম প্রসঙ্গে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, যে কোনো পণ্যের চাহিদাই তার বাজারদর নির্ধারণ করে। বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অবস্থা সবকিছু মিলিয়ে আমাদের রপ্তানি বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। এসবের প্রভাব পড়েছে গরুর চামড়ার দামের উপর। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাবের কারণেই অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে কোরবানির পশুর চামড়া দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হতে পারে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোরবানির চামড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের চামড়াশিল্পকে আরো শক্তিশালী ও রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত করা সরকারের লক্ষ্য। এজন্য আগামী জুলাইয়ের মধ্যে চামড়া খাতের উন্নয়ন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিসক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে।




