হাওরে নতুন আতঙ্ক বজ্রপাত

ধান কাটতে শ্রমিক-সংকট মেটাতে তিন শুল্ক স্টেশন বন্ধ করে দিয়ে মাইকিং চলছে
অনলাইন ডেস্ক: কোথাও ধান কাটা। কোথাও ধান মাড়াই। আবার কোথাও খলা তৈরির কাজ চলছে। অবশ্য বেশির ভাগ হাওরের ধান এখনো পাকেনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলছে এসব কর্ম। তাই এবার বৈশাখে কৃষকদের আনন্দের চেয়ে উদ্বেগ বেশি। যদিও আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বোরো ধান পুরোপুরি পাকবে। তবে শঙ্কা হচ্ছে সেই ধান কি নিরাপদে ঘরে তোলা যাবে। চলতি বোরো মৌসুমের জলবায়ুর প্রভাবে প্রথম দিকে অনাবৃষ্টি, তারপর অসময়ে অতিবৃষ্টিতে হাওরে জলাবদ্ধতা, এরপর যোগ হয় ডিজেল-সংকটের কারণে ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন চলাচল বিঘ্ন ঘটে। এদিকে কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতি সমাধানের লক্ষ্যে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে এখন বালি পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছেন। জেলার বড়ছড়া, বাগলী, চারাগাঁও তিনটি শুল্ক স্টেশন বন্ধ করে দিয়ে শ্রমিকদের ধান কাটায় নামার জন্য মাইকিং করাচ্ছেন।
কিন্তু সেখানেও আরেক বিপত্তি। এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত সিলেটের হাওরে ব্যাপক হারে বজ্রপাত ঘটে। আর এই বজ্রপাতে বেশির ভাগ নিহত হওয়ার ঘটনা হাওরে কর্মরত কৃষক ও জেলেদের ওপর। এখন হাওরবাসীর মনে যোগ হয়েছে নতুন আতঙ্ক বজ্রপাত। শনিবার সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার হাওরে বজ্রপাতে ছয় জনের মৃত্যু ঘটে। এরা শনিবার দুপুরে হাওরে ধান কাটছিলেন। এ সময় কালবৈশাখীতে দিরাই উপজেলার দুটি গ্রামের ১৩টি গরু মারা যায়। এখন অনেকেই মাঠে যেতে ভয় পাচ্ছেন।
এ দিকে হাওরে বজ্রপাতের ফলে জীবন অনেকটা অচল। বাজ ঠেকাতে কোটি টাকা অপচয়ের বিষয় আলোচনায় আসছে। এমনকি স্থাপিত বজ্রদণ্ড কাজ করছে কি না তাও সংশ্লিষ্টরা খোঁজখবর রাখেন না। বজ্রপাতে কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অসহায় একেকটি পরিবার। বাংলাদেশের বজ্রপাত পরিস্থিতি নিয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের পাঁচ গবেষকের একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, ২০১৫-২০২২ সময়ে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১২১ জনের মৃত্যু ঘটে সুনামগঞ্জে। এদের মধ্যে মহিলা ও শিশু-কিশোর রয়েছেন। হাওর অঞ্চলে বজ্রপাতে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দুঃখের জীবন পার করছেন খারাতুনের মতো অনেক বজ্রবিধবা। হাওরের বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে কৃষককে ধান কাটতে যেতে হয়, জেলেদের মাছ ধরতে যেতে হয়। বজ্রপাতের সময় তাদের খোলা আকাশের নিচে থাকতে হয়। হাওরে কোনো নিরাপদ আশ্রয়স্থলও নেই। এতে কৃষক ও জেলেদের মৃত্যু বেশি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জেলে পরিবারের জন্য তেমন কোনো ক্ষতিপূরণ, সহায়তা বা বীমা-সুবিধা নেই। বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে বিগত সরকার আমলে তালগাছ লাগিয়ে, বজ্রনিরোধক দণ্ড বসিয়ে অনেক টাকা খরচ করেছে। তাতে কাজের কাজ কিছু হয়নি।
সরকার বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত নারীদের ভাতা দিয়ে থাকে। বজ্রপাতে নিহতদের ২০ হাজার টাকা এককালীন সহায়তা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই সহায়তা পৌঁছে না। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের পূর্বাঞ্চলে বজ্রপাতের পরিমাণ বেশি। ভারতের খাসি পাহাড় ও মেঘালয় এলাকায় মার্চ থেকে মে মাস জুড়ে মেঘ জমে থাকে। স্থরে স্থরে মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে ঐ এলাকার পাদদেশে অবস্থিত সুনামগঞ্জে বজ্রপাতের সংখ্যাও বেশি। এ সময়টাতে হাওরের ফসল তোলায় ব্যস্ত থাকতে হয় কৃষকদের। সূত্র মতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে বজ্রপাতে নিহত হওয়ার ঘটনা বেশি।
সূত্র মতে, সরকার ২০১৬ সালের রেকর্ড মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দেয়। এ বছর বজ্রপাতে সারা দেশে মারা গিয়েছিল ৩৫০ জন (ডিজাস্টার ফোরামের হিসাব)। ঐ বছরই বজ্রপাতে নিহতের পরিবারকে মাত্র ২০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেটা আর বাড়েনি।
সূত্র মতে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন ৪৬ জন। তাদের মধ্যে ১৭ জন মারা যান ধান কাটার সময়। ১৫ জন মারা গেছেন মাছ ধরতে গিয়ে। বৃষ্টির সময় গরু আনতে গিয়ে মারা গেছেন চার জন। বাকিরা মারা গেছেন নদী পারাপার এবং পুকুরে গোসল করার সময়। সুনামগঞ্জ জেলায় বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অনেকেই সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে যান না। প্রশাসনের কাছে পূর্ণাঙ্গ হিসাবও থাকে না। সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের ছাদে একটি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো হয় ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে। এটা এখন কাজ করে কি করে না সংশ্লিষ্টরা বলতে পারেন না।




