মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে ট্রাম্পের দুর্বলতা, চীনের কৌশলগত সুযোগ

অনলাইন ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতার অধ্যায় শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের মনোযোগ ও সম্পদ এশিয়া থেকে সরে গেলে কৌশলগতভাবে চীন লাভবান হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

সরকারিভাবে বেইজিং হামলার নিন্দা জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং জি এ হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির প্রেক্ষাপটে বেইজিং বরাবরের মতোই আন্তর্জাতিক আইন ও স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তবে কূটনৈতিক অবস্থানের বাইরে চীন পরিস্থিতিকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগানোর সুযোগও দেখছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত হলে ওয়াশিংটনের নজর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরে যেতে পারে, যা তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংকে বাড়তি সময় ও সুবিধা দিতে পারে।

জ্বালানি ঝুঁকি
ইরানে হামলা চীনের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করেছে, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে। ধারণা করা হয়, সমুদ্রপথে ইরানের রপ্তানিকৃত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই চীন ক্রয় করে। এটি চীনের মোট সমুদ্রপথে আমদানি করা তেলের প্রায় ১৩ শতাংশ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এসব তেলের বড় অংশ ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার উৎস হিসেবে দেখানো হয়।

ইরানের সস্তা তেল হারালে চীন চাপের মুখে পড়বে, যদিও তা সামাল দেওয়া সম্ভব বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে এর আগে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে প্রভাব বিস্তার করায় আরেকটি সস্তা উৎসও ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশ— ইরান, ভেনেজুয়েলা ও রাশিয়া— থেকে আসা সরবরাহের একটি বড় অংশ অনিশ্চিত হয়ে গেছে।

রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের প্রধা ক্রিল ড্রাইমেটিভ ইতোমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। এরই মধ্যে বৈশ্বিক মানদণ্ড ক্রোড অয়েলের ৮২ ডলারে পৌঁছেছে, যা ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

কৌশলগত মজুত ও চুক্তি
২০২১ সালে চীন-ইরান ৪০০ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি করে। তবে প্রতিশ্রুত অর্থের অল্প অংশই বাস্তবে বিনিয়োগ হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানে সরকার পরিবর্তন হলে এই চুক্তিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তবে সম্ভাব্য ধাক্কা সামাল দিতে চীন আগেই প্রস্তুতি নিয়েছে। গত বছর দেশটি ব্যাপক হারে তেলের মজুত গড়ে তোলে। তথ্য অনুযায়ী, চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি ৪.৪ শতাংশ বেড়েছে, যার ৮০ শতাংশের বেশি মজুত করা হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন বা ইরানি সরবরাহ বন্ধ হলেও কয়েক মাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

অস্ত্র ভাণ্ডার ক্ষয় ও বিরল খনিজে চীনের প্রভাব
ইরানে নতুন সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ তৈরি করবে। গত বছর অস্ত্রের ঘাটতির কারণে পেন্টাগন ইউক্রেনে কিছু অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করেছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ‘অপারেশন এপিক ফিউরিতে’ প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে।

এসব উন্নত অস্ত্রব্যবস্থায় গ্যালিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ব্যবহার হয়, যার সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের সময় বেইজিং গ্যালিয়াম রপ্তানি সীমিত করে বৈশ্বিক শিল্পখাতে চাপ তৈরি করেছিল। ফলে নতুন করে মার্কিন অস্ত্র উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণে চীনের প্রভাব একটি কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

বৈশ্বিক দক্ষিণে ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক হিসাব
ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংহাই কো-অপারেশন অরগানাইজেশন এবং ব্রিকসে যোগ দিয়েছে। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নে চীন মধ্যস্থতা করেছিল। বর্তমান সংঘাত সেই সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি ও অনিশ্চিত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এশিয়ায় কৌশলগত ভারসাম্যে চীনের পক্ষে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তির চ্যালেঞ্জও বেইজিংকে সমানভাবে সামাল দিতে হবে।

Related Articles

Back to top button