সচিবালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময় কাটছে রুটিন কাজে

নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় প্রশাসন
অনলাইন ডেস্ক: বহুল প্রতিক্ষীত আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর মাত্র ১০ দিন বাকি। এই নির্বাচনকে ঘিরে অফিস-আদালত থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাজারঘাট ও চায়ের দোকানে চলছে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা। চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। এই ভোটের রেশ পড়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়েও। নির্বাচনকালীন সময়ে এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শুধু রুটিন কাজ করে সময় পার করছেন। রুটিন কাজের ফাঁকে নিজেদের মধ্যে ভোট নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে দেখা যায় তাদের। আলোচনার বিষয়বস্তু নতুন সরকার। সবাই নতুন সরকারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। গত কয়েক দিন সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে এমন দৃশ্যই দেখা গেছে।
গত কয়েক দিন সচিবালয়ের বেশ কয়েকটি দপ্তর ঘুরে দেখা যায়, সরকারি দপ্তরগুলোতে এখন আলোচনার প্রধান বিষয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গণভোট আর নতুন সরকার। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে আসা ঘনিষ্ঠদের সঙ্গেও নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন। তাদের আলোচনায় ওঠে আসছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কারা ক্ষমতায় আসছেন। গণভোটের ফলাফল কি হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিবর্তিত নতুন সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো কেমন হবে। গত ১১ ডিসেম্বর তপশিল ঘোষণার পর থেকে নীতি নির্ধারণী বিষয়গুলো এখন নির্বাচন কমিশনের হাতে। মন্ত্রণালয়গুলো শুধু কিছু রুটিন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য মন্ত্রণালয়গুলোতে তেমন ব্যস্ততা নেই বললেই চলে। আগের মতো সরগরম অবস্থা নেই। তপশিলের পর খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রদবদল বন্ধ থাকায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দর্শনার্থী বা তদবির নিয়ে কোনো ভিড় নেই। আবার বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত থাকায় ভিড় কমেছে প্রশাসন পাড়ায়। এই নীরব পরিস্থিতিতে নিয়মিত কাজের বাইরে বাড়তি চাপ না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কাজের চেয়ে নির্বাচনের খোঁজ বেশি রাখছেন। নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় আছেন তারা। কর্মকর্তারা বলছেন— সচিবালয় এখন অনেকটাই ‘প্রাণহীন’।
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন মানুষের সরব উপস্থিতি আর অতিরিক্ত গাড়ির চাপে সচিবালয়ের ভিতরেও যানজট লেগে থাকত। ডাক্তার, পুলিশ, শিক্ষা ক্যাডার, কৃষি ক্যাডারসহ অন্য কর্মকর্তাদের রদবদলের তদবির নিয়ে ভিড় লেগে থাকত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে। অথচ তপশিলের পর গত মাস থেকেই দেখা যায় সচিবালয়ের নিত্যকাজে ভাটা পড়ার দৃশ্য। কর্মচারীরা চুপচাপ অফিস করছেন আর রাজনৈতিক খোঁজ রাখছেন। কথার প্রসঙ্গে সচিবালয়ের একাধিক প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, এই মুহূর্তে সব মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি অনেক কম। রদবদল নেই। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে একটু ঢিলেঢালা চলছে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক কাজের গতি কমে যাওয়াকে নিয়মিত কাজের ব্যত্যয় হিসেবে দেখছেন জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন—নির্বাচনের আর কয়েকদিন বাকি। কর্মকর্তারা এখন আগের সেই পুরোনো ধারায় বসে আছে। এটি আগামী সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। কারণ, সরকার নীতি গ্রহণ করে। আর তা বাস্তবায়ন করে আমলাতন্ত্র। সরকার যাবে, সরকার আসবে। কিন্তু প্রশাসনের নিয়মিত কাজকর্মের গতি একই রকম থাকবে, এটাই হওয়া উচিত। এর ব্যাতিক্রম হওয়া কাম্য নয়। যেটা আমাদের সামনে আপাতত দেখা যাচ্ছে না। তাদের মতে, কর্মকর্তাদের কেউ কেউ পদ ধরে রাখতে আবার কেউ কেউ ভালো পদে বসতে এখন থেকেই সম্ভাব্য ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এমন সংবাদ জাতির জন্য হতাশাজনক।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব আব্দুল আউয়াল মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনের অজুহাতে প্রশাসনিক কাজে গতিহীনতা কাম্য নয়। সরকার যাবে, সরকার আসবে। কর্মকর্তারা তাদের যে নিয়মিত কাজ, তা তারা আগের মতোই করবে, এমনটাই হওয়া উচিত। যেমন তারা সঠিক সময়ে অফিসে আসবে, হাতের কাজগুলো করবে। পেন্ডিং ফাইলগুলো নিষ্পত্তি করবে। নতুন করে কিছু করার আছে কি না, সেটা খুঁজে বের করবে। সাবেক এই সচিব বলেন, ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে আমরা তখন পুরোদমে কাজ করেছি। নির্বাচনের সঙ্গে আমাদের দাপ্তরিক কাজের সম্পর্ক ছিল না। এখন যদি সেটা না হয়ে থাকে, তাহলে সেটা স্বাভাবিক কাজের ব্যত্যয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন সরকারের অপেক্ষায় আগ্রহ থাকাটা সমস্যা নয়, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু নিয়মিত কাজকর্ম বন্ধ করে নয়। আর রাষ্ট্রের পলিসিগত কোনো সিদ্ধান্ত হয়তো সরকার নেবে না। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক কাজে কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই।




