কেন কারা ফটকে নিতে হলো ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী-সন্তানের মরদেহ

প্যারোলে মুক্তির জটিলতা, নাকি প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাব?
প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন: আসক
অনলাইন ডেস্ক: স্ত্রী ও ৯ মাসের সন্তানের মৃত্যুতেও প্যারোলে মুক্তির অনুমতি পাননি বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। এ কারণে শনিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে স্ত্রী-সন্তানের মরদেহ আনা হয় তাকে দেখানোর জন্য। এরপর লাশ বাগেরহাটে নিয়ে দাফন করা হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুতেও প্যারোলে মুক্তি না হওয়ায় দেশ জুড়ে সমালোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, প্যারোলে মুক্তির জটিলতা নাকি প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাব! মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা।
কানিজের বাবা জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘মেয়ে আমাকে বারবার বলেছিল, তোমার জামাইয়ের মুক্তির ব্যবস্থা কর। আমি সাদ্দামের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে একাধিকার কথা বলেছি, সে আমাকে বলেছে জামিন তো হচ্ছে, কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ ছাড়ছে না। একটা মামলায় জামিন হলে পুলিশ আরেকটা মামলা দিচ্ছে। সব মিলিয়ে ওর বিরুদ্ধে ১১টি মামলা দিয়েছে। অথচ দুইটা মামলার এজাহারে ওর নাম আছে। এই কারণে চরম হতাশ হয়ে পড়েছিল কানিজ। আমি মেয়ের মৃত্যুর বিচার চাই।’ কানিজের বাবা রুহুল আমিন এই ঘটনায় বাদী হয়ে শনিবার থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। তবে মামলায় কাউকে আসামি করেননি। সাদ্দামের ছোট ভাই মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাবি ভাইকে খুব ভালোবাসত। তাকে জেল থেকে বের করতে না পারায় সে অনেক ভেঙে পড়েছিল।’ কানিজ ও তার সন্তান সেজাদের মরদেহ শুক্রবার লাশবাহী গাড়িতে করে যশোর কারাগারের সামনে নেওয়া হয় বন্দি সাদ্দামকে শেষবার দেখানোর জন্য। সেখানে সাদ্দাম পাঁচ মিনিটের কম সময় পান তাদের দেখার জন্য। সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই বাচ্চাকে কোলে নিতে পারেনি। এই আক্ষেপে গতকাল বলছে, জীবিত অবস্থায় আমি আমার বাচ্চাকে কোলে নিতে পারলাম না, মৃত্যুর পর কোলে নিয়ে কি করব? সে সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেছে, আমি ভালো বাবা হতে পারলাম না, আমি ভালো স্বামী হতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিও। এটা ছিল আমার ভাইয়ার শেষ কথা।’
স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পরও সাদ্দামকে কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সবখানে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে যশোরের জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাদ্দামের প্যারোলের জন্য কোনো আবেদনই করা হয়নি। তবে সাদ্দামের মামা মো. হেমায়েত উদ্দিন বলেন, ‘প্যারোলের জন্য আমি প্রথমে ডিসি (বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক) অফিসে গেছিলাম। শুক্রবার অফিস তো বন্ধ ছিল। পরে আসরের নামাজের পর তার বাংলোয় গেছিলাম। সেখানে আমি লিখিত আবেদন দিই। পরে জেল সুপারের সঙ্গে কথা বলে জানায়, এটা এখানে আইনে কাভার করে না, ভাই আমরা সরি। আমি তখন বারবার চেষ্টা করলাম। তখন আমি বলি কী করার? আমরা কি জেল সুপারের কাছে যাব? সেখান থেকে জানানো হয় বন্দি যদি বাগেরহাটে থাকতেন, তা হলে আমরা প্যারোলে মুক্তি দিতে পারতাম।’ তারপর সন্ধ্যায় বাগেরহাটের জেল সুপারের কাছে যাই। তিনি বলেন, ‘দেখেন সে আছে তো যশোরে। এটা তো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। লাস্ট একটা কাজ করতে পারেন, আপনারা মরদেহ নিয়ে যশোর কারাগারে গিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আসতে পারেন। প্যারোলের জন্য আমাদের কেউ যশোরে আবেদনের বিষয়ে বলেনি। আমরা বারবার বলেছি, এমন কোনো ওয়ে আছে কি না যে মাধ্যমে আমরা এটা করতে পারব। আমরা তো জানিই না যশোরে আবেদন করতে হবে। এটা তো কেউ আমাদের বলেনি।’
২০২৫ সালের এপ্রিলে গোপালগঞ্জ থেকে ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তিনি বর্তমানে ১১টি মামলায় যশোর কারাগারে আছেন। এ বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেছেন, ‘শুক্রবার আমি যখন নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত ছিলাম, প্যারোলে মুক্তির জন্য একজন গিয়েছিল, এ বিষয়ে আমি জানতে পারি জেল সুপারের মাধ্যমে।’ তিনি জানান যে ঐ বন্দি আছে যশোর কারাগারে। আমার সঙ্গে তাদের সরাসরি কথা হয়নি। তবে একটি লিখিত আবেদন তারা দিয়ে যায়। তখন তাদের জানানো হয়, এটা আসলে যশোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে হবে। জেল সুপারও যশোর কারাগারে বিষয়টি আগাম জানিয়ে রাখে। তবে যশোরে তারা আবেদন করেছে, না করেনি, তা আর আমাদের জানা হয়নি।
জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে আইনি দিক উল্লেখ করে বলেন, প্যারোল নীতিমালা (২০১৬) অনুযায়ী, যে জেলায় বন্দি কারাগারে আছেন, সেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এই প্যারোলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। যেহেতু এই বন্দি বাগেরহাটের কারাগারে ছিলেন না, তাই তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা তাদের ছিল না। তবে তারা সত্ পরামর্শ দিয়েছেন বলে তার দাবি।
তবে সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন জেলা প্রশাসক সঠিক কথা বলেননি। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল আবেদনটি যশোর জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো। জেলা প্রশাসক কেন, তারা যদি ইউএনওর কাছেও আবেদন করতো তিনি একইভাবে এটা প্রক্রিয়া করতে পারতেন। কিন্তু নিজের জেলায় বন্দি নেই বলে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক দায় এড়াতে পারেন না। একজন সাধারণ মানুষ তো তার কাছে থাকা প্রশাসনের কাছেই যাবে। তারাই ব্যবস্থা করবেন। এর আগেও এমন অনেক নজির আছে।
এই ঘটনায় যশোর জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেল একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়, বাগেরহাট কারাগার থেকে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর সাদ্দামকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। তার স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো ধরনের আবেদন করা হয়নি।
সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদ বলেন, এখানে কারা কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি নেই। প্যারোল সাধারণত কারা কর্তৃপক্ষ দেখে না, প্যারোল বাস্তবায়ন করে কারা কর্তৃপক্ষ। মূলত প্যারোল দেয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, এটা তার এক্তিয়ার। আমাদের কাছে প্যারোলের আদেশ এলে ওই আদেশের একটা অংশ হিসেবে বন্দিকে সংশ্লিষ্ট পুলিশের হাতে হস্তান্তর করি। আমার সঙ্গে একজন যোগাযোগ করেছিল তারা লাশ কারা গেটে আনতে চায়। আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাদের দেখা করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। এর বাইরে আমাদের কিছু করার ছিল না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক বন্দি জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে যশোর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর কোনো আবেদন করা হয়নি। সাদ্দামের পারিবারের মৌখিক অভিপ্রায় অনুযায়ী যশোর জেলগেটে স্ত্রী ও সন্তানের লাশ দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে এ বিষয়ে যশোর জেলা প্রশাসন ও যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা করে, বিভিন্ন গণমাধ্যম সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার সমুন্নত রাখবে। তবে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদনের ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বিজ্ঞপ্তিতে।
গত শনিবার রাত ১২টার দিকে নামাজে জানাজা শেষে বাগেরহাটে পারিবারিক কবরস্থানে গৃহবধূ কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালী (২২) ও তার ৯ মাস বয়সি শিশুসন্তানের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে কানিজের বাবার বাড়ির কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় মা-ছেলেকে। এর আগে স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে রাত ১১টা ২০ মিনিটে তাদের জানাজার নামাজ হয়। এর আগে গত শুক্রবার দুপুরে সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে কানিজের স্বামীর বাড়ি থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ এবং ৯ মাস বয়সি ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। কানিজ সুবর্ণা নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলার সভাপতি জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দামের স্ত্রী। জুয়েল বর্তমানে যশোর জেলা কারাগারে আছেন।
প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা সত্ত্বেও মুক্তি না দিয়ে কেবল কারাফটকে দেখানো সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে আসক এ কথা জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারী। একজন বিচারাধীন বন্দি হিসেবে জুয়েল হাসান সাদ্দাম এসব সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত নন। অথচ তার স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুজনিত চরম মানবিক পরিস্থিতিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ অস্বীকার করা কার্যত তাকে অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শিকার করেছে।




