শোক আর আনন্দ মেশানো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

অনলাইন ডেস্ক: বিশাল মাঠের চারদিকে ধর্মগুরুরাসহ হাজার হাজার দায়ক-দায়িকা, ভক্ত ও দর্শনার্থীর উপস্থিতি। মাঠের এক পাশে বিশেষভাবে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন সাজে সজ্জিত স্বর্গরথের পুষ্পবিছানায় শায়িত মরদেহ। এর পাশেই গান ও বাদ্যের তালে তালে চলছে বর্ণিল দলবদ্ধ নৃত্য। নাচ-গানে তুলে ধরা হচ্ছে প্রয়াত ব্যক্তির কর্মজীবন ও সমাজে তার অবদান। ধর্মগুরুদের পরিচালনায় চলছে বিশেষ প্রার্থনা। দুই দিনব্যাপী এসব আচার-অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে দায়ক-দায়িকা ও ভক্তদের বজ্রকণ্ঠে ‘সাধু, সাধু’ ধ্বনির মধ্যে আতশবাজি নিক্ষেপ করে স্বর্গরথে ১০৩ দিন শায়িত মরদেহ দাহকার্য সম্পন্ন করা হয়।

শনিবার সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ির রামগড়ে মারমা সম্প্রদায়ের সোনাইআগা পুষ্প বৌদ্ধ বিহারের প্রয়াত বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত জতিকা মহাথেরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এভাবেই মহাকর্মযজ্ঞের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এমন রাজসিক শবদাহ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান সাধারণত বিশিষ্ট বৌদ্ধ ধর্মগুরু বা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্যই আয়োজন করা হয়ে থাকে।

শুক্র ও শনিবার দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় সোনাইআগা পুষ্প বৌদ্ধ বিহারের প্রয়াত বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত জতিকা মহাথেরের এই রাজকীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান। তিনি গত ১৫ সেপ্টেম্বর নিজ বিহারে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও রীতি অনুযায়ী বিশেষ প্রক্রিয়ায় তাঁর মরদেহ সংরক্ষণ করা হয়। ১০৩ দিন পর শনিবার রাজসিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মাধ্যমে কয়েক হাজার দায়ক-দায়িকা ও ভক্ত তাকে চিরবিদায় জানান।

দুই দিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মনোমুগ্ধকর ও বৈচিত্র্যময় ‘সইং নৃত্য’। মারমা ভাষায় একে বলা হয় ‘সইং তালাহ আখা’, যার অর্থ ‘শবদাহ নৃত্য’। সংক্ষেপে এটি ‘সইং আখা’ নামে পরিচিত। মারমা ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই নৃত্য। ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে নারী ও পুরুষেরা দলবদ্ধভাবে সইং নৃত্য পরিবেশন করেন। খ্যাতিমান বৌদ্ধ ভিক্ষু, রাজা, হেডম্যান (মৌজাপ্রধান) ও অভিজাত ব্যক্তিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মূলত এই নৃত্যের আয়োজন করা হয়।


নাচ–গানে তুলে ধরা হচ্ছে প্রয়াত ব্যক্তির কর্মজীবন এবং সমাজে তার অবদান।
ভদন্ত জতিকা মহাথেরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বান্দরবান উজানিপাড়া নারী সইং নৃত্যদল, ফাক্ষ্যংগ্রীপাড়া সইং দল, কুকিমারা মহিলা সইং নৃত্যদল, মহামুনি সইং নৃত্যদলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত একাধিক নারী-পুরুষ সইং নৃত্যদল অংশগ্রহণ করে।

বাঁশের মাচার ওপর রঙিন কাগজে সাজানো প্যাগোডা কাঁধে নিয়ে ৮ থেকে ১০ জনের একটি সইং নৃত্যদল গান ও বাজনার তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করে। দলগুলো প্রতিযোগিতামূলকভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সইং আখা পরিবেশন করে। প্রতিটি দলে নাচ-গান ও বাদ্যের জন্য তিনজন দলনেতা থাকেন। পয়ার ছন্দে করুণ সুরে গান পরিবেশনের সঙ্গে সামনে-পেছনে ও উঁচু-নিচু ভঙ্গিতে নৃত্য করেন শিল্পীরা। একটি দল ক্লান্ত হলে অন্য দল নৃত্য পরিবেশন করে।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আয়োজন কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, বৌদ্ধ মহাথের ও সমাজের অভিজাত ব্যক্তিদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই এই অভিজাত সইং নৃত্যের আয়োজন করা হয়। গান ও নৃত্যের মাধ্যমে প্রয়াত ব্যক্তির কর্মজীবন ও সমাজে তাঁর অবদান তুলে ধরা হয়। উৎসবমুখর আয়োজনে হাজারো মানুষের কাছে প্রয়াত ব্যক্তি হয়ে ওঠেন স্মরণীয়।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় দিনের বেলায় সইং নৃত্য শেষে রাতে ঐতিহাসিক গীতিনাট্য ‘জ্যাত ও পাংখুং’ মঞ্চস্থ করা হয়। এতে মারমা সমাজের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য ফুটে ওঠে।

সইং নৃত্যের পাশাপাশি তরুণীদের পরিবেশনায় ‘এয়ইং’ নামে আরেক ধরনের শোকনৃত্যও অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিল্পীরা দোলনায় রক্ষিত মরদেহ ঘিরে নেচে-গেয়ে প্রয়াত ব্যক্তির গুণকীর্তন করেন এবং তাঁর স্বর্গ ও নির্বাণ কামনা করেন। শোকাবহ এই উৎসবে ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান শেষে প্রার্থনার মাধ্যমে আবেগঘন পরিবেশে প্রয়াত ব্যক্তিকে বিদায় জানানো হয়। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শীল প্রদান ও স্মরণসভার পর বিশেষ একধরনের বাজি ফুটিয়ে মরদেহ দাহ করা হয়।

সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) পালি বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনবোধি ভিক্ষু। স্বধর্ম দেশনা দেন তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন বিহারের বিহারাধ্যক্ষরা। অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও ২৯৮ নম্বর আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ওয়াদুদ ভুইয়া, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (রামগড় সার্কেল) ওবাইন (পিপিএম), বাংলাদেশ মারমা ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ও স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ম্রাসাথোয়াই মারমাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

Related Articles

Back to top button