সবার সঙ্গে ঘটনাস্থলে যান মুয়াজ্জিন, অথচ তিনিই ছিলেন হত্যাকারী

অনলাইন ডেস্ক: টাকা ধার চেয়ে না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে যান মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. মোশারফ হোসেন (৪২), হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন নাজমা আলমকে (৫১)। এরপর ঘরে থাকা স্বর্ণালংকার ও টাকা লুট করে নেন। হত্যার আলামত নষ্ট করে চলে যান। পরে এই হত্যার কথা জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন মোশারফ। এর ১৬ ঘণ্টা পরেই পুলিশি তদন্তে বের হয়ে আসে মোশারফ হোসেনই সেই হত্যাকারী।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এস এম মাহবুব রেজওয়ান সিদ্দিকী সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাস বেতকা এলাকায়। মোশারফ হোসেন শহরের বেতকা চার রাস্তা মোড়ের মসজিদের মুয়াজ্জিন।

নাজমা আলমকে হত্যার দায় স্বীকার করে মঙ্গলবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন মোশারফ হোসেন। জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন টাঙ্গাইলের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম মাহবুব খান। আদালতে জবানবন্দি গ্রহণের পর রাত আটটায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। মোশারফ টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাস বেতকা চার রাস্তা মোড়ের মসজিদের মুয়াজ্জিন।

নাজমা আলম টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাস বেতকা এলাকার বাসিন্দা শফিউল আলম ওরফে শাহীনের স্ত্রী। পেশায় ভেটেরিনারি চিকিৎসক শফিউল আলম গত রোববার সকাল ৯টার দিকে তার পেশাগত কাজে বাসার বাইরে যান। এ সময় তার স্ত্রী নাজমা আলম বাসায় একা ছিলেন। বেলা সাড়ে ১১টার সময় তাদের গৃহকর্মী বাসায় আসেন। গৃহকর্মী নাজমা আলমদের বাসার মূল দরজা চাপানো দেখতে পান। ঘরে ঢুকে সোফার ওপরে হাত বাঁধা রক্তাক্ত ও জ্ঞানহীন অবস্থায় নাজমা আলমকে পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে শফিউল আলম ফিরে আসেন। এ সময় তিনি বুঝতে পারেন তার স্ত্রীর দুই হাতের সোনার বালা, গলায় থাকা মালা এবং কিছু টাকা চুরি হয়ে গেছে। বাসার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ডিভিআর (ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার) মেশিন নেই, মনিটরটিও ভেঙে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তদন্ত শুরু করে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোশারফ হোসেন এসেও এ ঘটনায় উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। সেখানে আসা গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দেন। তিনি হত্যাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের দাবি জানান।

পরে নিহত নারীর স্বামী শফিউল আলম বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশের একটি দল তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এবং স্থানীয় তথ্যদাতাদের মাধ্যমে অনুসন্ধান শুরু করেন। তাদের সন্দেহ হয় মসজিদের মুয়াজ্জিন মোশারফ হোসেনের প্রতি। গতকাল সোমবার পুলিশ মোশারফ হোসেনকে আটক করে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মোশারফ জানান, রোববার সকালে তিনি কিছু টাকা ধার চাইতে যান নাজমা আলমের কাছে; কিন্তু তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন তার হাতে ও গলায় সোনার গয়না দেখতে পান। পরে সেখানে মোশারফ চা পান করেন। পরে হাত ধোঁয়ার উসিলায় বেসিনের কাছে গিয়ে সেখান থেকে হাতুড়ি এনে নাজমা আলমের মাথায় জোরে আঘাত করেন। তখন নাজমা আলম অজ্ঞান হয়ে যান। তার দুই হাতে থাকা দুটি স্বর্ণের বালা, গলায় থাকা একটি স্বর্ণের লকেটযুক্ত চেইন এবং নগদ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে নেন। একপর্যায়ে নাজমা আলম গোঙাতে শুরু করেন। তখন গামছা দিয়ে তাঁর হাত বাঁধেন এবং গলায় রশি পেঁচিয়ে ধরেন।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মোশারফ আরও বলেন, নাজমা আলমকে হত্যার আলামত ধ্বংস করার জন্য তিনি সিসিটিভির ডিভিআর মেশিন খুলে নেন এবং মনিটরটি ভেঙে নষ্ট করেন। তিনি এগুলো ওই এলাকার একটি নালায় ফেলে দেন। মসজিদে তার থাকার জায়গায় গিয়ে রক্ত লেগে থাকা পোশাক ধুয়ে ফেলেন। পরে নাজমা আলমের বাড়িতে গিয়ে অন্যান্য প্রতিবেশীর সঙ্গে মিশে ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করতে থাকেন। গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদকালে মোশারফ হোসেন আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার সম্মতি দেন। মঙ্গলবার তাঁকে টাঙ্গাইল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়।

এ মামলায় পুলিশ শহরের থানা পাড়া এলাকা থেকে সন্তোষ কর্মকার নামের একজন জুয়েলারি ব্যবসায়ীকেও সোমবার গ্রেপ্তার করেন। তার কাছে মোশারফ হোসেন লুট করা স্বর্ণালংকার বিক্রি করেছিলেন। সন্তোষ কর্মকারের কাছ থেকে ওই স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বিশ্বাস বেতকা চার রাস্তার মোড়ের জামে মসজিদে মোশারফ হোসেনের বালিশের নিচ থেকে ২৬ হাজার ৩২০ টাকা এবং হত্যাকাণ্ডের সময় পড়ে থাকা পায়জামা–পাঞ্জাবি জব্দ করা হয়।

Related Articles

Back to top button