সম্পর্ক জোড়া লাগাতে বলিউডে ‘চীন-বিদ্বেষ দৃশ্য’ বন্ধের নির্দেশ

অনলাইন ডেস্ক: লাদাখের বিতর্কিত সীমান্ত গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর দীর্ঘ চার বছর ধরে ভারত ও চীনের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল। তবে সম্প্রতি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বরফ গলতে শুরু করায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পে।

বেইজিংয়ের সাথে নয়াদিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বলিউডে ‘চীন-বিদ্বেষী’ সিনেমা নির্মাণে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনার পর গালওয়ান সংঘর্ষের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একাধিক বড় বাজেটের সিনেমার নাম পরিবর্তন, দৃশ্য বাদ দেওয়া বা পুরো প্রজেক্টই বাতিল করার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

বলিউড মেগাস্টার সালমান খানের বহুল প্রতীক্ষিত একটি যুদ্ধভিত্তিক সিনেমার নাম প্রথমে রাখা হয়েছিল ‘ব্যাটল অব গালওয়ান’। কিন্তু ভারত সরকারের আপত্তির মুখে ছবিটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘মাতৃভূমি: মে ওয়ার রেস্ট ইন পিস’। শুধু তাই নয়, সিনেমাটির প্রায় ৪০ শতাংশ দৃশ্য নতুন করে রি-শুট করতে হয়েছে।

A screenshot taken from footage recorded in June 2020 and released by China Central Television in 2021 shows Chinese and Indian soldiers clashing in the Galwan Valley. Photo: CCTV/AFP

অন্যদিকে, গালওয়ান সংঘর্ষে নিহত বীর চক্র পদকপ্রাপ্ত ভারতীয় সেনা সদস্য সিপাহী গুরতেজ সিংয়ের জীবনীর ওপর ভিত্তি করে নির্মিতব্য ‘দ্য লায়ন অব গালওয়ান’ সিনেমাটির কাজ পুরোপুরি স্থগিত করে দিয়েছেন প্রযোজক হিমালয় দাসানি।

প্রযোজক দাসানি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘মিড-ডে’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন,

“আমাদের বলা হয়েছে সিনেমায় কোনোভাবেই ‘চীন-বিদ্বেষ’ বা চীনকে আক্রমণ করে কিছু দেখানো যাবে না। যুদ্ধের মূল কারণ বা প্রতিপক্ষই যদি সিনেমায় উহ্য রাখতে হয়, তবে এমন সিনেমা বানানোর কোনো মানে হয় না।”

২০২৪ সালের অক্টোবরে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত টহল এবং সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর থেকেই বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সালমান খানের সিনেমার টিজার মুক্তির পর চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। বেইজিংয়ের অভিযোগ ছিল, ছবিতে ঐতিহাসিক সত্য বিকৃত করে চীনের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এর পরপরই ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন সিনেমাটির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। এখন থেকে চীন বা সীমান্ত সংঘাত নিয়ে যেকোনো সিনেমা বানাতে গেলে আগে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ভারত সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশের প্রথিতযশা চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক ও শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, এটি ভারতের চলচ্চিত্র জগতের “নির্বাচিত বাক-স্বাধীনতার” এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

চলচ্চিত্র নির্মাতা ওনিল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

“পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সিনেমায় বিষোদ্গার করলে কোনো সমস্যা হয় না, কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে কেন এই নিষেধাজ্ঞা? অথচ গত বছরের ‘অপারেশন সিন্দুর’ (ভারত-পাকিস্তান সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাত) এর সময় এই চীনই পাকিস্তানকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল।”

ডকুমেন্টারি নির্মাতা অদিতি শর্মা সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া পাকিস্তান-বিরোধী অ্যাকশন থ্রিলার ছবি ‘ধুরন্ধর’-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন, “সেই সিনেমার ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্য পরিবর্তন বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হয়নি। এমনকি আসামের মুখ্যমন্ত্রী জনসভায় দাঁড়িয়ে বলেছেন এই সিনেমাটি দেখলে মানুষ বিজেপিকে ভোট দেবে। বার্তাটি একদম পরিষ্কার—আপনি পাকিস্তানকে সিনেমার মাধ্যমে যত ইচ্ছা আক্রমণ করতে পারেন, কিন্তু চীনকে ছোঁয়া যাবে না। এটি কোনো নীতি নয়, এটি সিনেমার মাধ্যমে প্রক্সি পররাষ্ট্রমূল্য চালানো।”

An Indian paramilitary soldier stands guard at check point along a road leading to Ladakh, near the disputed Line of Actual Control. Photo: EPA-EFE

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেমা স্টাডিজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ইরা ভাস্কর বলেন, “পাকিস্তানিদের ভিলেন বানানো খুব সহজ, কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে ভারতের হাত-পা বাঁধা। ভারতে বাক-স্বাধীনতা সবসময় প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের সমীকরণে বন্দি থাকে।”

অবশ্য সরকারের এই কূটনৈতিক কৌশলের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন ভারতের অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জি. ডি. বকশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক শুল্ক নীতির কারণে ভারতের সম্পর্ক কিছুটা শীতল উল্লেখ করে তিনি বলেন, 

“চীন যদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়, তবে ভারতের যেচে ঝগড়া করার কোনো দরকার নেই। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সরকার যদি কিছু সিনেমার দৃশ্য পরিবর্তন করতে বলে, তবে তার পেছনে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা রয়েছে। সেনাদের বীরত্বের গল্প পরে সঠিক সময়ে পর্দায় আসবে।”

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা এবং ৪ জন চীনা সেনা নিহত হন। দীর্ঘ চার বছর পর ২০২৪-এর শেষে এসে দুই দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছায়, যার প্রভাবেই এখন বলিউডকে বাধ্য হয়ে ‘চীন-তোষণ’ বা ‘চীন-বিদ্বেষ’ থেকে দূরে থাকার নীতি গ্রহণ করতে হচ্ছে।

Related Articles

Back to top button