নগর পরিবহনে ভাড়া দ্বিগুণ আদায়ের অভিযোগ

রাজধানী থেকে টেকনাফের ভাড়া বাড়ল ৬৫ টাকা, পঞ্চগড়ের ৬০ টাকা
অনলাইন ডেস্ক: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে দামের সঙ্গে সমন্বয় করে দূরপাল্লার বাসভাড়া ১১ পয়সা বাড়িয়ে কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। নতুন ভাড়া অনুযায়ী রাজধানী থেকে দেশের দক্ষিণের শেষ প্রান্ত টেকনাফ পর্যন্ত নন-এসি বাসের ভাড়া বেড়েছে ৬৫ টাকা এবং উত্তর প্রান্ত পঞ্চগড়ের ভাড়া বেড়েছে ৬০ টাকা।
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—বর্তমানে ৪০ সিটের বাসের ভাড়া নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি হচ্ছে (প্রতি কিলোমিটার ভাড়া গুণন দূরত্ব গুণন ৫১ সিটের বাস) ৪০ টাকা। রুটভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) দেওয়া দূরত্ব, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও সওজের আওতাধীন ব্রিজ, টোল ও ফেরির ভাড়ার তালিকা অনুসরণ করে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের মে মাসে তৈরি করা বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী দেখা গেছে—ঢাকা (গাবতলী) থেকে পঞ্চগড়ের (রুট-৯৩) দূরত্ব ৪২৪ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ১ হাজার ১৮০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ৬০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৪০ টাকা।
ঢাকা (সায়েদাবাদ) থেকে টেকনাফের (রুট-৫০) দূরত্ব ৪৬২ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ১ হাজার ২৭০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ৬৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৩৫ টাকা।
ঢাকা থেকে সাত বিভাগীয় শহরের ভাড়া :ঢাকা (সায়েদাবাদ) থেকে চট্টগ্রামের (রুট-৪৮) দূরত্ব ২৪২ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ৬৭০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ৩৪ টাকা বেড়ে হয়েছে ৭০৪ টাকা। ঢাকা (গাবতলী) থেকে রাজশাহীর (রুট-৮২) দূরত্ব ২৪৭ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ৭০০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ৩৮ টাকা বেড়ে হয়েছে ৭৩৮ টাকা। ঢাকা (সায়েদাবাদ) থেকে খুলনার (রুট-৯৬) দূরত্ব ২০৫ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ৬৫০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ৩০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৬৮০ টাকা।
ঢাকা (সায়েদাবাদ) থেকে বরিশালের (রুট-৩৫) দূরত্ব ১৭১ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ৫৬৫ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ২৬ টাকা বেড়ে হয়েছে ৫৯১ টাকা। ঢাকা (সায়েদাবাদ) থেকে সিলেটের (রুট-৫৭) দূরত্ব ২৫৭ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ৭০০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ৪০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৭৪০ টাকা। ঢাকা (গাবতলী) থেকে রংপুরের (রুট-৮৮) দূরত্ব ৩০৮ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ৮৭০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ৪১ টাকা বেড়ে হয়েছে ৯১১ টাকা। ঢাকা (মহাখালী) থেকে ময়মনসিংহের (রুট-১৫) দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ৩১৫ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ১৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ৩৩০ টাকা। এ ছাড়া বেশি যাত্রী চলাচলকারী ঢাকা (সায়েদাবাদ) থেকে কক্সবাজারের (রুট-৪৯) দূরত্ব ৩৯৬ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ১ হাজার ৯০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ৫৭ টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১৪৭ টাকা। ঢাকা (সায়েদাবাদ) থেকে কুমিল্লার (রুট-১৮) দূরত্ব ১০২ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ২৯০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ১৬ টাকা বেড়ে হয়েছে ৩০৬ টাকা। ঢাকা (গাবতলী) থেকে বগুড়ার (রুট-৮৪) দূরত্ব ১৯১ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ৫৫০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ২৮ টাকা বেড়ে হয়েছে ৫৭৮ টাকা। এছাড়া দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ রুট দিনাজপুর থেকে টেকনাফের (অন্যান্য রুট-১৬৮) দূরত্ব ৮৪৪ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া ছিল ২ হাজার ৩৪০ টাকা। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সেই ভাড়া ১১৭ টাকা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৪৫৭ টাকা।
নগর পরিবহনে ভাড়া দ্বিগুণ আদায়ের অভিযোগ :ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরসহ আন্তঃজেলা রুটে বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে, বাস্তবে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও নগর পরিবহনে ঘুরে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়।
যাত্রীরা জানান, নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর থেকে অনেক বাসে আগের তুলনায় ১৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। নগর পরিবহনে নতুন হার অনুযায়ী ভাড়া বাড়ার কথা সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ টাকার মধ্যে।
গাবতলী থেকে সদরঘাটগামী যাত্রী মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে যেখানে ৪০ টাকা ভাড়া দিতাম, এখন সেখানে ৬০ টাকা দাবি করেছে। বলছে তেলের দাম বেড়েছে, তাই ভাড়াও বেড়েছে। ভাড়া তো এত বাড়েনি। শেষ পর্যন্ত ৫০ টাকা দিয়ে আসতে হলো।’
সদরঘাট থেকে বিমানবন্দর রুটের যাত্রী সানজু ইসলাম বলেন, ‘নির্ধারিত ভাড়ার কোনো হিসাব নেই। যার যা ইচ্ছা নিচ্ছে। প্রতিবাদ করলে তর্কে জড়িয়ে পড়তে হয়।’ একই অভিযোগ করেন উত্তরা থেকে গুলিস্তানগামী এক যাত্রী। তিনি বলেন, ‘ভাড়া বাড়বে এটা বুঝি, কিন্তু হুট করে ২০ টাকা বাড়িয়ে নিচ্ছে। কোনো তালিকা বা নির্দেশনাও দেখায় না বাসচালক ও সুপারভাইজাররা।’ কয়েকটি বাসের সুপারভাইজার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি ভাড়া নিচ্ছেন না, বরং মালিক সমিতির পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় আগের ভাড়াই যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বাসের হেলপার জানান, তার কাছে এখনো নতুন ভাড়ার তালিকা আসেনি। মালিকরা কিছু বলেননি। তাই আগের মতোই ভাড়া নিচ্ছেন। কেউ বেশি নিলে সেটা আলাদা বিষয়।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ভাড়া বৃদ্ধির পর পরই কার্যকর মনিটরিং না থাকলে এ ধরনের অনিয়ম বাড়ে। তাই নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দ্রুত দৃশ্যমানভাবে বাসে টানানো এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করতে হবে।




