যুদ্ধের প্রভাব

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি
অনলাইন ডেস্ক: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পালটে দিয়েছে অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ। এমন কোনো খাত নেই, যেখানে এর প্রভাব পড়বে না। ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তেই পড়ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়ে। এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি পণ্যের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং এর সঙ্গে পরিবহন, সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য ও ব্যবহার্য পণ্য, ওষুধ, নির্মাণশিল্প, পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প—সব খাতের ভোক্তা ও ব্যবহারকারী সম্পর্কিত। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতির সব খাতে।
এদিকে রপ্তানিকারকরা এখন উদ্বিগ্ন উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকা নিয়ে। উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে বাড়তি দাম পণ্যের ওপর সমন্বয় করতে চাইবেন। যার ধাক্কা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়বে। কারণ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয়সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যার প্রভাবে পণ্য বিক্রিও কমে যায়। ফলাফল দেশের সার্বিক অর্থনীতির গতি কমে যায়।
অয়েল প্রাইস ডট কমের তথ্যানুযায়ী গতকাল রবিবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্র্যান্ড ক্রুড) দাম ৯০ দশমিক ৩৮ ডলারে নেমেছে। যুদ্ধবিরতির আগে এর দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় ৫০ দিন পেরিয়ে গেছে। যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে তেলের উৎপাদনও কমে গেছে। যে পরিমাণ তেল কম উৎপাদিত হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য বিপুল। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সময় যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কম উৎপাদিত হয়েছে, তার মূল্য ৫ হাজার কোটি ডলার। স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর প্রভাব আগামী কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত অনুভূত হবে। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯৮০ সালের পর পঞ্চম বারের মতো ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে।
গত কয়েক বছর ধরেই দেশের সাধারণ মানুষ নানা সংকটে জর্জরিত। করোনা মহামারির ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, অভ্যন্তরীণ বাজারের অস্থিরতা সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই অবস্থাকে সংকটে রূপ দিল। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত হাজার মাইল দূরে হলেও এর উত্তাপ এসে পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। ইতিমধ্যে দেশের বাজারেও জ্বালানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা ও পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈশ্বিক এই সংকট কতটা প্রভাব ফেলছে, তার হিসাবনিকাশ হচ্ছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বাড়লে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হবে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪ শতাংশ বাড়তে পারে এবং প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ কমে গিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেবে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির যে প্রভাব, সেটি ইতিমধ্যে পড়ে গেছে। মূল্য বৃদ্ধির আগেই দেশে খোলা বাজারে বেশি মূল্যে কৃষক, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে জ্বালানি কিনে ব্যবহার করার সংবাদ গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এপ্রিলের শুরুতে এই মূল্য বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে যেটুকু দাম বাড়ানো হয়েছে, বাস্তবতার বিবেচনায় সেটি যথেষ্ট নয় বলে তিনি মনে করেন। চলমান এই বৈশ্বিক সংকটে সারা বিশ্বের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষ যারা দারিদ্রসীমার কাছাকাছি রয়েছে, তাদের সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। ইতিমধ্যে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করছে। তবে সামাজিক সুরক্ষার সুফল যাতে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আগে থেকে চলমান কর্মসূচিগুলোও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এই দুঃসময়ে কঠিন বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়া এখন বিকল্প নয়, বাধ্যবাধকতা। আসছে বাজেটে ভর্তুকি কমিয়ে ব্যয়সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবে ব্যয়ের কাটছাঁট যেন নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর প্রভাব না পড়ে, সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে।



