অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন: বিশ্বব্যাংক

- চলতি অর্থবছর প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.৯ শতাংশে
- ২০২৫ সালে নতুন দরিদ্র হয়েছে ১৪ লাখ মানুষ
অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। গতকাল বুধবার প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, টানা তিন বছর ধরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ধীরগতি হয়েছে। এসময় দারিদ্র্য বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চাপে থাকা ব্যাংকিং খাত, দুর্বল রাজস্ব আহরণের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এর প্রভাবে দারিদ্র্র্য হ্রাসের গতি কমবে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। মূল্যস্ফীতির হারও সাড়ে ৮ শতাংশে থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধির কারণে রাজস্ব চাপ, এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কঠোর আর্থিক ও মুদ্রানীতি এবং দুর্বল ব্যাংকিং খাতের কারণে দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের কম। যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।
তবে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেদনে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব বৃদ্ধি, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার জন্য জরুরি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়। গতকাল প্রতিবেদন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস আলোচনার আয়োজন করে। এতে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জাঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি ছিল স্থিতিস্থাপকতা। তবে রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাত ও ব্যবসার পরিবেশে দৃঢ় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই স্থিতিস্থাপকতা টেকসই হবে না। আরো শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে এবং ভালো মানের কর্মসংস্থান তৈরি করতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার অপরিহার্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে অর্থাত্ উচ্চ অবস্থানে থাকতে পারে। কারণ খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত উভয় খাতেই ব্যয় বেড়েছে। নিম্নআয়ের মানুষের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি, ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যার ফলে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্য হয়ে পড়েছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল, চলতি বছ রে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসবে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এখন ধারণা করা হচ্ছে মাত্র ৫ লাখ মানুষ এবছর দারিদ্র্যসীমার বাইরে আসতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আর্থিক খাতেও ঝুঁকি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে। তবে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে আরো নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু করায় ডলারের দাম স্থিতিশীল হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। তবে রপ্তানি খাতে গতি কমেছে। প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ কম রয়েছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। যেখানে তৈরি পোশাক খাতের মতো কিছু বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে, সেখানে অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উচ্চ নিয়ন্ত্রক ব্যয়, অনির্ভরযোগ্য অবকাঠামো এবং অর্থায়নের সীমিত সুযোগের কারণে সমস্যায় পড়ছে। প্রতিবেদনে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, শক্তিশালী প্রতিযোগিতা নীতি, বাণিজ্য নীতি সহজ করা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাভাস প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৬.৩ শতাংশে নামতে পারে। তবে ২০২৭ সালে তা আবার বেড়ে ৬.৯ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।




