আজ বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস

পাহাড়ে বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন, বাড়ছে শিকার ও পাচার
অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের তিন পার্বত্য জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বৃক্ষনিধন, জুম চাষ, ভিনদেশি কাসাভা, কচুসহ বিভিন্ন চাষাবাদের জন্য বনভূমি উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং বেপরোয়া শিকারের কারণে মূল্যবান বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সাম্বার হরিণ, মেঘচিতা, গয়াল, বনরুই, সজারু, ধনেশসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখি বিলুপ্তির পথে।
শত বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেঙ্গল টাইগার, অন্তত তিন ধরনের হরিণ, বনছাগল (হরিণজাতীয় প্রাণী), দুই শিংয়ের গন্ডার, হাতি, তিন ধরনের ভালুক, মার্বেল ক্যাট (ছোপযুক্ত বিড়াল), গয়াল, বনগাই, চিতাবাঘ, বন্য শূকর, বনমোরগ, ময়ূর, কাঠবিড়ালি, বন্য মহিষ, অজগর, বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ, নদীর হাঙরসহ বহু বন্যপ্রাণী ও পাখির দেখা পেয়েছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম প্রশাসক আর. এইচ. স্নেইড হাচিনসন। ১৮৯০ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে তিনি এসব প্রাণীর বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। ১৯০৬ সালে কলকাতার ‘দ্য বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট বুক ডিপো’ থেকে প্রকাশিত তার লেখা An Account of the Chittagong Hill Tracts গ্রন্থে এ অঞ্চলের বন্যপ্রাণীর বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
তিনি উল্লেখ করেন, বন্য গয়াল সবচেয়ে বেশি পাওয়া যেত রামগড় ও মানিকছড়িতে। কিন্তু বিগত অর্ধশত বছরেও এ এলাকায় প্রাণীটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
৫ হাজার ১৩৮ বর্গমাইল আয়তনের পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে মোট ১ হাজার ১২১ বর্গমাইল সংরক্ষিত বনাঞ্চল (রিজার্ভ ফরেস্ট) এবং ২ হাজার ৪৬৩ বর্গমাইল অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল হিসেবে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। ব্যাপক বৃক্ষনিধন ও চাষাবাদের কারণে বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে পাহাড়গুলো অনেকাংশে বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। বনশূন্য হয়ে আবাসস্থল ও উপযোগী পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় এবং নির্বিচারে শিকারের ফলে বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মনিরুল এইচ খানের তথ্যমতে, গত এক শতাব্দীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে গন্ডার, বর্মি ময়ূর, বানতেং (এক ধরনের বন্য মহিষ) ও শ্লথ বেয়ার সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গেছে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক কিছু অনুসন্ধানে প্যারা হরিণ ও গাউরের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গত বছর রাঙামাটির দুর্গম কাচালং বনে সূর্য ভালুক, কালো ভালুক, সাম্বার হরিণসহ বেশ কিছু বন্যপ্রাণীর দেখা পাওয়া গেছে। এছাড়া ওই বনে বেঙ্গল টাইগারের বিচরণেরও তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। তবে বন রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ না হলে অচিরেই এসব বিপন্নপ্রায় প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, একসময় হাতি, সাম্বারসহ বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ, খরগোশ, বনমোরগ, বনমহিষ, গয়াল, লজ্জাবতী বানর, চশমাপড়া হনুমান, নেকড়ে, বাঘডাস, ভালুক, বন্য শূকর, উল্লুক, বনকুকুর, শিয়াল, বনরুই, বনবিড়াল, বেজি, সজারু, গুইসাপ, অজগর, গোখরা, ফণাসহ নানা প্রজাতির সাপ ব্যাপকভাবে দেখা যেত। এখন এসব প্রাণী সচরাচর চোখে পড়ে না।
একসময় হরেক রকম পাখির কলতানে পাহাড়ের মানুষের ভোরের ঘুম ভাঙত। এখন সেই সুমধুর কলতান আর শোনা যায় না। ময়না, টিয়া, ঘুঘু, ডাহুক, কাকাতুয়া, ধনেশসহ অনেক পাখিই আগের মতো দেখা যায় না।
নব্বইয়ের দশকেও ২০-২৫টি বন্য হাতির পাল খাগড়াছড়ির রামগড় এলাকায় বিচরণ করত। কিন্তু এখন পুরো জেলায় তাদের অস্তিত্ব নেই। রামগড়ের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান জানান, বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় খাদ্যের সন্ধানে হাতির পাল সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ত্রিপুরায় চলে গেছে। রাঙামাটি ও বান্দরবানের বনে হাতি থাকলেও হত্যা ও দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কারণে সংখ্যা দিন দিন কমছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, গত ৯ বছরে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে ১১৪টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ৭টি, বিদ্যুতের ফাঁদে ২৬টি, দুর্ঘটনায় ১৮টি, অসুস্থতায় ৪০টি, বার্ধক্যে ১৫টি এবং অজ্ঞাত কারণে ১০টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। দাঁত ও হাড় সংগ্রহের পাশাপাশি মাংসের জন্যও হাতি শিকার করা হচ্ছে।
মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন সাঙ্গু-মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনে পরিচালিত এক গবেষণায় হাতির মাংস শিকারের প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই গবেষণার প্রতিবেদন ১৬ অক্টোবর কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়।
বন্যপ্রাণী দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ায় বর্তমানে হরিণ, শূকর ও বনমোরগ শিকারিদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। দেশীয় তৈরি বন্দুক, জাল ও বিষটোপ ব্যবহার করে এসব শিকার করা হচ্ছে। জীবিত হরিণ, টিয়া, ময়না, গুইসাপ, তক্ষকসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পার্বত্য এলাকা থেকে সমতলে পাচার করা হচ্ছে।
গত ৬ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি পৌরসভার তেঁতুলতলা এলাকার একটি বাগানবাড়ি থেকে এশীয় কালো ভালুক, ৬টি মায়া হরিণ ও দুটি বানর উদ্ধার করে বন বিভাগ।
বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটির সংগঠক সমীর মল্লিক বলেন, গত কয়েক দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বন অনেকাংশে উজাড় হয়ে গেছে। ফলে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং মানুষের মাংস খাওয়ার প্রবণতার কারণে তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, বন্যপ্রাণী রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জীববৈচিত্র্যের অন্যতম অঞ্চল হলেও তিন জেলায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পৃথক কোনো অফিস নেই। খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিয়া জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “বন্যপ্রাণী প্রকৃতির অলংকার। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা অপরিসীম। তাই মূল্যবান বন্যপ্রাণী রক্ষায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।”




