আস্থাহীনতার শেয়ার বাজারে নতুন সরকারের বড় পরীক্ষা

  • ভালো শেয়ারের জোগান  না থাকায় বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে: ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম
  • শেয়ার বাজারের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর উন্নতির ওপর নির্ভর করবে: আবু আহমেদ
  • অনেক বিনিয়োগকারী জানেই না, বিনিয়োগ শিক্ষার সুযোগ আছে: ওয়াজিদ হাসান শাহ

অনলাইন ডেস্ক: দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, মানসম্মত কোম্পানির ঘাটতি এবং বিনিয়োগকারীদের গভীর আস্থাহীনতার মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। এ প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না তা এখন একটি বড় প্রশ্ন। নির্বাচনের পর আট কার্যদিবসের মধ্যে দুই কার্যদিবসে বড় উত্থান হলেও ছয় কার্যদিবসই দরপতন দেখেছে। বাজারে শেয়ারের দরের এই ওঠানামা কি স্বাভাবিক, নাকি গভীর সংকটের লক্ষণ? কেন বাজার বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও স্থিতিশীল হতে পারছে না?

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, নানা কারণে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে ভালো কোনো কোম্পানি আসেনি। ভালো শেয়ারের জোগান না থাকায় বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের ঢাকা ও চট্টগ্রাম দুই স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই ও সিএসই) উন্নত বিশ্বের স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আগাতে পারছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে। শেয়ার বাজারের ভেতরের মৌলিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত কিছু সমস্যা রয়েছে। যা দীর্ঘ মেয়াদে বাজারকে অস্থির, অগভীর ও ঝুঁকিপূর্ণ করে রাখে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয়ই দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক সমস্যায় ভুগছে। তা হলো,  ভালো ও বড় মূলধনী কোম্পানির স্বল্পতা। উন্নত বাজারে যেমন ব্লু-চিপ কোম্পানি সূচকের মূল ভিত্তি গড়ে, বাংলাদেশে তেমন কোম্পানির সংখ্যা সীমিত। তালিকাভুক্ত বহু কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন দুর্বল, করপোরেট গভর্ন্যান্স প্রশ্নবিদ্ধ, ডিভিডেন্ড অনিয়মিত। ফলে সূচক ওঠানামা করে অল্প কয়েকটি বড় কোম্পানির ওপর নির্ভর করে। এখানে লিকুইডিটি সংকট দীর্ঘস্থায়ী। বড় বিনিয়োগকারী ঢুকতে চাইলে দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, আবার বের হতে গেলে বাজারে ধস নামে। বিগত বছরগুলোতে একাধিকবার শেয়ার দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো, ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’, প্লেসমেন্ট শেয়ারের অপব্যবহার ইত্যাদি অভিযোগ রয়েছে। ডিএসই দেশের মূল বাজার হলেও, তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নজরদারি কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন আছে। ট্রেডিং সিস্টেম আধুনিক হলেও মার্কেট সার্ভেইল্যান্স কতটা কার্যকর?  ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পর পরিচালনায় স্বচ্ছতা কতটা বেড়েছে? সিএসই তুলনামূলক ছোট, লেনদেন কম, বাজার প্রভাব সীমিত। দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে প্রতিযোগিতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নয়। উন্নত দেশে স্টক এক্সচেঞ্জগুলো স্বশাসিত হলেও কঠোর নিয়ন্ত্রক নজরদারির আওতায় চলে। স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি ও বাজার গভীরতা তিনটি স্তম্ভেই তারা এগিয়ে।

আস্থার সংকট : গত দেড় দশক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শেয়ার বাজারে বড় উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটেছে। ২০১০-১১ সালের বুদবুদ ও ধস এখনো বিনিয়োগকারীদের স্মৃতিতে তাজা। পরে একাধিকবার সূচক বাড়লেও তা স্থায়ী হয়নি। এই দীর্ঘ অস্থিরতার মধ্যে এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। নির্বাচনের পর শেয়ার বাজারে দুই কার্যদিবস বড় উত্থান ছিল প্রত্যাশা-নির্ভর। কিন্তু টানা দরপতন ইঙ্গিত দেয় আস্থা এখনো ভঙ্গুর। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএসইসি আইপিও নীতিমালা, মার্জিন ঋণ নীতিমালা, ক্যাটাগরি রিভিউসহ বেশ কিছু সংস্কার করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংস্কার কি যথেষ্ট? পুঁজিবাজারের স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, বাজারের উন্নয়নে দ্রুত ভালো কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসতে হবে ও রেগুলেটরি বডি রিফর্ম করতে হবে। সাইফুল ইসলাম বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেন সরকারের অধীন না হয়ে আইন অনুযায়ী কাজ করে কিন্তু একই সঙ্গে জবাবদিহির মধ্যে থাকে। বিএসইসির কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, জবাবদিহি ও প্রয়োগ ক্ষমতা আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে।

বিনিয়োগ শিক্ষাদেশে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় বাজারে প্রবেশ করে। ফান্ডামেন্টাল বিশ্লেষণ, ক্যাশ ফ্লো, ঋণ-ইকুইটি অনুপাত এসব বিষয়ে সচেতনতা কম। ফলে গুজবভিত্তিক লেনদেন বাড়ে। উন্নত বাজারে ইনভেস্টর এডুকেশন প্রোগ্রাম বাধ্যতামূলক ও কাঠামোগত। বাংলাদেশে তা সীমিত এবং প্রভাবহীন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম)-এর নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ওয়াজিদ হাসান শাহ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ শিক্ষায় আগ্রহ কম কেন? এ বিষয়টা নিয়ে গবেষণা দরকার। অনেক বিনিয়োগকারী জানেই না, বিনিয়োগ শিক্ষার সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। বিআইসিএম-এর এই নির্বাহী প্রেসিডেন্ট বলেন, বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত হলে দেশের শেয়ার বাজারের গভীরতা বাড়বে, গুজব নির্ভর লেনদেন কমে যাবে।

কেন বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না : ব্যাংক ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে মূলধন বাজারকে শক্তিশালী করা জরুরি। নতুন সরকারের জন্য এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক পরীক্ষাও। আস্থা ফিরলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। সরকারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, শেয়ার বাজারের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর উন্নতির ওপর নির্ভর করবে। এসব সূচকের মধ্যে রয়েছে সুদহার যৌক্তিকীকরণ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আনা, ইজ অভ ডুয়িং বিজনেসের র‍্যাংকিংয়ে উন্নতি, দেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সঠিক সময়ে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করা। আবু আহমেদ বলেন, সার্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকা নির্ভর করবে এই চ্যালেঞ্জগুলো কতটা কার্যকরভাবে এবং দ্রুততার সঙ্গে মোকাবিলা করা হচ্ছে, তার ওপর।

Related Articles

Back to top button