আলোচনায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ঝুলন্ত পার্লামেন্ট, ক্ষমতা হস্তান্তর ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে আসতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে। কোনো দল কি একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, নাকি দেশ পেতে পারে একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট- এমন প্রশ্নের পাশাপাশি নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর ও নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়াও উঠে আসছে আলোচনায়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিনে ভোটাররা গণভোটেও অংশ নেবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে দৃশ্যত প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এই প্রেক্ষাপটে ‘একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা’, ‘ঝুলন্ত পার্লামেন্ট’, ‘কোয়ালিশন সরকার’ ও ‘ক্ষমতা হস্তান্তর’- এই ধারণাগুলোর অর্থ ও প্রক্রিয়া নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও।
সংসদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংসদের মোট আসনের অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ অর্ধেক+১ আসন পেলে সেটিকে একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বলা হয়।
বাংলাদেশের ৩০০ আসনের সংসদে এ সংখ্যাটি ১৫১। যুক্তরাজ্যের হাউজ অব কমন্সে ৬৫০ আসনের মধ্যে ৩২৬ এবং ভারতের লোকসভায় ৫৪৩ আসনের মধ্যে ২৭২ আসন পেলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরা হয়।
সাধারণত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বা জোটের নেতাকেই রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। তবে কোনো দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও সর্বাধিক আসন পাওয়া দলকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়, শর্ত থাকে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন প্রমাণ করতে হবে।
বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে বিএনপি এবং ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় অন্য দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিল।

কোনো নির্বাচনে যখন কোনো দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না, তখন সেই পরিস্থিতিকে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট বলা হয়। এ অবস্থায় সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর মধ্যে জোট বা সমঝোতা প্রয়োজন হয়।
যুক্তরাজ্যে ২০১০ ও ২০১৭ সালের নির্বাচনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০১০ সালে কনজারভেটিভ পার্টি লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে জোট করে সরকার গঠন করে। ২০১৭ সালে টেরিজা মে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার চালান।
ভারতেও বিভিন্ন সময়ে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হয়েছে। ১৯৯৬ সালে বিজেপি সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকার মাত্র ১৩ দিন টিকে ছিল।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে একাধিক দল মিলে যে সরকার গঠন করে সেটিই কোয়ালিশন সরকার। সাধারণত বেশি আসন পাওয়া দল নেতৃত্ব দেয়, আর ছোট দলগুলোর সমর্থনে সরকার টিকে থাকে।
বাংলাদেশে ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট সরকার গঠন করেছিল। তবে এ ধরনের সরকারে ছোট দলগুলোর চাপ বড় দলকে সামাল দিতে হয়; সমর্থন প্রত্যাহার হলে সরকারও পড়ে যেতে পারে। পাকিস্তানে ২০২২ সালে ইমরান খানের সরকার এভাবেই অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা হারায়।

সরকার গঠনের জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট হলেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। সংসদের মোট আসনের দুই-তৃতীয়াংশ পেলে সংবিধান সংশোধন বা গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করা সহজ হয়। বাংলাদেশের সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও এই বিধান রয়েছে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের নেতাকে রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের আহ্বান জানান। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়- এটিই ক্ষমতা হস্তান্তর।
এর আগে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন, সংসদ গঠিত হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সংসদ নেতা নির্বাচন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতান্ত্রিক চর্চায় শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশে এমন উদাহরণ তুলনামূলক কম।
সূত্র/বিবিসি বাংলা




