প্রার্থীদের স্ত্রী-সন্তানরাও প্রচারণার মাঠে

অনলাইন ডেস্ক: দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবার প্রার্থী তালিকায় নারীদের সংখ্যা প্রত্যাশিত সংখ্যক না হলেও ভোটের মাঠে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। দলীয় শীর্ষ থেকে শুরু করে অনেক প্রার্থীকেই ভোটের মাঠে স্ত্রী সন্তানসহ নিকটাত্মীয়দের পাশে রেখে নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা গেছে। অনেক মঞ্চে স্বামীর জন্য ভোট প্রার্থনা করছেন স্ত্রী-সন্তানরা। এতে নারী ভোটারদের মধ্যে আগের চেয়ে বেশি কৌতূহল আর আগ্রহ তৈরি হয়েছে, মিলছে ব্যাপক সাড়া। প্রচারণায় যুক্ত কর্মীরা বলছেন, সস্ত্রীক ভোটের মাঠে থাকায় প্রার্থীরা বেশি সাড়া পাচ্ছেন। যা ব্যালট বাক্সে ভোট পড়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন ডান, বাম, ইসলামি ধারার দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচারণায় মাঠে হাজির হচ্ছেন পরিবারের সদস্যরাও। তবে স্ত্রীদের নিয়ে ভোটের মাঠে গিয়ে ভালো সাড়া পাচ্ছেন প্রার্থীরা। রাজধানীসহ সারা দেশের প্রার্থীরা এখন ছুটছেন ভোটারদের দরজায়। অনেকের সঙ্গে সার্বক্ষণিক রয়েছেন তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা এবং নিকটাত্মীয়রা।

দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে গত ২১ জানুয়ারি সিলেট থেকে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে করেই সেই প্রচারণা শুরু করেন। জনসাধারণের কাছে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ভোট চান। এর পর থেকে ভোটের মাঠে ডা. জুবাইদা রহমান যেন তারেক রহমানের ছায়াসঙ্গী হয়ে আছেন। তিনি কথা কম বলছেন, তার উপস্থিতি এবং হেসে কুশল বিনিময়ই ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে প্রচারণার মাঠে।

তারেক রহমানের পক্ষে নির্বাচনী গণসংযোগে অংশ নিয়েছেন কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও। ভোটারদের উদ্দেশে জাইমা রহমান বলেন, আমি তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান। আমার বাবা ঢাকা-১৭ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী। আপনাদের কাছে তার পক্ষে ভোট চাই।

পাশের বাড়ির মেয়েটির মতো সহজিয়া ভঙ্গিতে জাইমা গুলশানের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের কাছে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইছেন। এ সময় তিনি পথচারী, রিকশাচালক, সিএনজিচালক, দোকানি, ফুটপাতের বিক্রেতা ও শপিংমলে আসা সাধারণ ভোটারদের হাতে নির্বাচনী লিফলেট বিতরণ করছেন। গণসংযোগকালে গুলশান এলাকার বিভিন্ন অফিস ও ব্যাংকের ভেতরেও উপস্থিত ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান এবং লিফলেট বিতরণ করেন। 

গণসংযোগে জাইমা রহমানের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপার্সন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার পরিচর্যাকারী ফাতেমা খাতুনকেও দেখা যাচ্ছে প্রচারণার মাঠে।

এ ছাড়া তারেক রহমানের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন তার প্রয়াত ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী সৈয়দা শর্মিলা রহমান সিঁথিও। প্রচারণাকালে শর্মিলা রহমান সিঁথি বলেন, ‘আজকে আমি ভাইয়া তারেক রহমানের জন্য আসছি। আপনারা সবাই ভাইয়ার জন্য দোয়া করবেন আর ভাইয়াকে একটা ভোট দেবেন।’ কড়াইল বস্তি এলাকার টিঅ্যান্ডটি কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে উঠান বৈঠকও করেন শর্মিলা রহমান। বৈঠকে তিনি উপস্থিত নারীদের কাছে তারেক রহমানের জন্য ভোট ও দোয়া চান।

ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাসের নির্বাচনী প্রচারণায় তার স্ত্রী আফরোজ আব্বাস সক্রিয়ভাবে গণসংযোগ করছেন। বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতার পক্ষে তার স্ত্রী ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন এবং বিগত সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতাও তুলে ধরছেন। আফরোজা আব্বাসের এই গণসংযোগ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

স্বামীর পক্ষে ভোট চাইতে মাঠে নেমেছেন বিএনপি মনোনীত ঢাকা-১৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। তিনি বলেন, ববি হাজ্জাজকে জয়ী করে আনতে হবে, ইনশাআল্লাহ্। এখানে আমাদের অনেক আইনজীবী ভাইবোন আছেন। আমি নিজেও একজন আইনজীবী। আমরা আপনাদের জন্য সত্যিকার অর্থে কাজ করতে এসেছি। উন্নয়ন করার উদ্দেশে আমাদের ঢাকা-১৩ আসনে আসা। দোয়া করবেন এবং আমাদের সঙ্গে থাকবেন।

গাজীপুর-৫ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফজলুল হক মিলন তার স্ত্রী সম্পা হককে নিয়ে গত ২৪ জানুয়ারি কালীগঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে গান গেয়ে ভোট চাইতে দেখা গেছে। সস্ত্রীক নেতার মুখে গান শুনে উপস্থিত নেতাকর্মীসহ ভোটাররা হাততালি দিয়ে প্রশংসা করেন। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন দলের প্রার্থীদেরও দেখা যাচ্ছে সস্ত্রীক ভোট চাইতে। চট্টগ্রাম-৫ আসনের (হাটহাজারী, বায়েজীদ আংশিক) বিএনপির প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনর স্ত্রী নওশীন আরজান চৌধুরীকে নিয়ে ভোটারদের দরজায় দরজায় যাচ্ছেন। তাদের কাছে পেয়ে খুশি ভোটাররাও।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বাইরেও জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই। ঠাকুরগাঁও- ১ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার  জীবনের শেষ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ৭৭ বছর বয়সি এই প্রবীণ রাজনীতিবিদের নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হয়েছে ভিন্ন মাত্রা। তার পক্ষে ভোট চাইতে মাঠে নেমেছেন তার বড় মেয়ে, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী চিকিত্সাবিজ্ঞানী শামারুহ মির্জা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন, শুনছেন সাধারণ মানুষের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা।

হাট-বাজার, গ্রামীণ উঠান কিংবা পাড়া-মহল্লা—সব জায়গাতেই শামারুহ মির্জাকে দেখা যাচ্ছে পথসভা ও ঘরোয়া বৈঠকে। এসব আয়োজনে তিনি তুলে ধরছেন বাবা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তার দৃঢ় অবস্থান এবং মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন ভূমিকার কথা। পাশাপাশি তিনি ভোটারদের ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ারও আহ্বান জানাচ্ছেন।

নির্বাচনী প্রচারে ফেনী-৩ আসনে প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু। পাশে ছায়া হয়ে আছেন তার স্ত্রী, তিন সন্তান, দুই ভাই ও এক জনের স্ত্রী। মিন্টুর স্ত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়াল, বড় ছেলে বাফুফের সভাপতি তাবিথ এম আউয়াল, মেজো ছেলে তাসরিফ এম আউয়াল ও ছোট ছেলে তাজওয়ার এম আউয়াল আলাদা আলাদাভাবে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও সভা করছেন। বাবার জন্য নির্বাচনী গণসংযোগে নেমেছেন তাবিথ আউয়াল ও ক্রীড়া সংগঠক তাজওয়ার আউয়াল। দিনভর তারা ফেনী-৩ আসনে বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তিন জনই নতুন ও তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে মাঠে কাজ করছেন। আর নারী ভোটারদের টার্গেট করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গণসংযোগ, প্রচারপত্র বিলি ও উঠান বৈঠক করছেন আবদুল আউয়াল মিন্টুর স্ত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়াল। ফলে ভোটের মাঠে প্রার্থীদের স্ত্রীদের ভোট প্রার্থনা নতুনমাত্রা যুক্ত করেছে নির্বাচনী প্রচারণায়। একইভাবে মিন্টুর ছোট ভাই দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন ও তার স্ত্রী উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শাহিনা আকবরও পৃথকভাবে ছুটছেন পথে-প্রান্তরে। আকবর ছুটছেন পুরুষ ভোটারদের টার্গেট করে, আর শাহিনা ঘুরছেন নারীদের নিয়ে। এ ছাড়াও এসব পরিবারের আত্মীয়স্বজনরাও এখন ভোটের মাঠে মিন্টুর জন্য সক্রিয়। ধানের শীষের পক্ষে ভোটারদের কাছে ছুটছেন মিন্টুর পিতা ও মাতার পক্ষের আত্মীয়রাও। একইভাবে তাদের শ্বশুর পক্ষের আত্মীয়রাও মিন্টুর জয় নিশ্চিতে গণসংযোগসহ প্রচারণায় একাট্টা। স্বজনদের এই তত্পরতাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন ভোটাররা। তবে তারা বলেন—ভোটের আগে যেমন তারা এলাকায় আসছেন, তেমনি ভোটের পরেও যেন এই সংযোগ রক্ষা করেন এবং জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতির কথা।

Related Articles

Back to top button