দুর্নীতি-লুটপাটে জড়িত লুকিয়ে থাকা সব অপরাধীর বিচার করা হবে: নির্বাচনী ভাষণে নাহিদ ইসলাম

অনলাইন ডেস্ক: ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দেশবাসী আমাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দিলে বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত লুকিয়ে থাকা সব অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি বিধান করা হবে।

গতকাল রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নির্বাচনী ভাষণে এ কথা বলেছেন নাহিদ ইসলাম। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যে যুক্ত হয়ে ৩০টি আসনে নির্বাচন করছে নাহিদ ইসলামের দল এনসিপি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত শ্বেতপত্র অনুযায়ী, হাসিনা ও তার মদদপুষ্ট আওয়ামী ব্যবসায়ী ও আমলারা এই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে—যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে এনেছে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার লুটপাটকৃত এই বিশাল অঙ্কের অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালানোর কথা বললেও তাদের অবহেলা ও অজ্ঞতার কারণে এখন পর্যন্ত কোনো সাফল্য অর্জিত হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত ফ্যাসিবাদী যুগের সুবিধাভোগী কিছু শীর্ষ আমলা ও বিশেষজ্ঞেরা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করায় এই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরুদ্ধার বিঘ্নিত হয়েছে।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, দেশবাসী যদি আমাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। লুটপাট ও অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। খুনি হাসিনার দোসর ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের সুবিধাভোগী আমলা ও আত্মীয়-স্বজনদের আইন ও বিচারের আওতায় আনা হবে।

তিনি বলেন, ‘জনগণ যদি এনসিপির ওপর আস্থা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি এবং কারও ওপর অতি নির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা হবে। আমরা অগণতান্ত্রিক শাসকদের নতজানু নীতিকাঠামো ভেঙে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করব। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে সার্ক পুনর্জীবিত করা হবে এবং আসিয়ানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাব।’

তিনি আরও বলেন, প্রবাসে থাকা নাগরিকদের সমস্যা সমাধান ও দ্রুত সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে পৃথিবীর সব প্রান্তে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করা এবং কূটনীতিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। লক্ষ্য হবে, পৃথিবীর সম্ভাবনাময় সব দেশে নামমাত্র খরচে জনবল রপ্তানি করা এবং তারা যাতে কোথাও কোনোভাবে হেনস্থার শিকার না হয়, সেই সুরক্ষা দেওয়া।

নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, ‘একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্যমূল্যে ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করা। লাগামহীন দ্রব্যমূল্যে মানুষ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন সরকারের ভূমিকা হবে সক্রিয়ভাবে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের মূল্য সবসময়ই সর্বাধিক। এর কারণ এ দেশে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্র বাজার নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে প্রচুর অর্থ নিজেদের পকেটস্থ করে। আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব।’

নাহিদ বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। এমন দুষ্টু চক্রের বিরুদ্ধে আইন করে তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, কারসাজি ও অবৈধ মজুতদারি প্রমাণিত হলে অপরাধীরা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে।

এনসিপির এই নেতা বলেন, কৃষকেরা যাতে তাদের শস্য ও কৃষিপণ্য কাউকে কোনো চাঁদা বা তোলা না দিয়ে বিক্রি করতে পারে এবং পাইকারি ব্যবসায়ীদেরকেও যেন কাউকে কোথাও এক টাকাও না দিতে হয়, সরকার তা নিশ্চিত করবে। কঠোরভাবে এই পদক্ষেপগুলো নিশ্চিত করা গেলে বাজারে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

তিনি বলেন, চাঁদাবাজ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অযৌক্তিকভাবে সারাদেশে সাধারণ মানুষকে পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়। সরকার ন্যায্যমূল্যের বাজার ব্যবস্থা এবং ওএমএস কর্মসূচি বিস্তৃত করবে। যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ সহজে সুলভে পণ্য কিনতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ‘বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনী কার্যত একটি দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। তাদের অত্যাচার ও জুলুমের কারণে মানুষ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মতো পুলিশকেও ‘‘পুলিশলীগ” নামে ডাকতে শুরু করেছিল। দেশে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যারা তখনকার পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়নি।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও পুলিশ ব্যাপক নৃশংসতা করেছে। আমরা সরকার গঠন করলে জুলাই বিপ্লবের সময় এবং গত ১৫ বছর ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য হত্যা, নির্যাতন, জুলুম, মিথ্যা মামলা, দস্যুবৃত্তি করে অর্থ লোপাট ও ঘুষ দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল— তাদের প্রত্যেককেই বিচারের আওতায় আনা হবে।

‘বাংলাদেশ কখনোই আফগানিস্তান হবে না, এটা বাংলাদেশই থাকবে। অনুকরণীয় হতে পারে মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক সমাজ। যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও নাগরিকতা নির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবার সহাবস্থান থাকবে। ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গায়, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, নারীর অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করাই হবে অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। আমরা বিশ্বাস করি, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাঙ্গন, যানবাহন, জনসমাগমস্থল, এমনকি ঘরের ভেতরেও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি চাকরি, রাজনীতি, জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকারসহ সব পর্যায়ে নারীদের যৌক্তিক অংশগ্রহণের সুযোগ অবারিত করা হবে। গৃহস্থলে সহিংসতা, যৌন হয়রানিসহ সব ধরনের নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।

এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, সার, বীজসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ বিতরণ ব্যবস্থা সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের লুটেরা গোষ্ঠীর কারণে এসব উপকরণ অনেক সময় প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। আমরা নিশ্চিত করব যাতে কোনো সিন্ডিকেট বা লুটেরা গোষ্ঠী সার ও বীজ বাজারজাতকরণের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে অধিক মূল্য আদায় করতে না পারে।

তিনি বলেন, দেশে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মতো দুইটি সরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত কৃষকদের কাছে এই ঋণ পৌঁছায় না। কৃষি ঋণ নিতে গেলে জমির দলিল, আইডি কার্ড ও নানা কাগজপত্রের নামে কৃষকদের হয়রানির শিকার হতে হয়। ঋণের অর্থ পেতে কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়। এই জটিলতা ও অনিয়মের কারণে প্রকৃত কৃষক সমাজ কৃষি ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। এনসিপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে ঋণ প্রক্রিয়ায় কাগজপত্রের নামে সব ধরনের হয়রানি ও অনিয়ম বন্ধ করা হবে। কৃষি ঋণ সহজলভ্য করা হবে।

Related Articles

Back to top button