বিএনপির চেয়ারম্যান হচ্ছেন তারেক রহমান

অনলাইন ডেস্ক: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিএনপির ‘চেয়ারপারসন’ পদ শূন্য হয়ে পড়েছে। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে কবে, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হবে—সে বিষয়ে এখনো দলীয় সিদ্ধান্ত হয়নি। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় বিষয়টি দ্রুতই নিষ্পত্তি করতে হবে বিএনপিকে।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলের ভেতরে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বাস্তব প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচনী প্রচারের ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, লিফলেট ও ডিজিটাল পোস্টারে কার ছবি ব্যবহার করা হবে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে দলকে।

দীর্ঘদিন নানা জটিল রোগে ভুগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর সকাল ছয়টায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর ফলে দলীয় ‘চেয়ারপারসন’ পদটি শূন্য হয়। এমন এক সময়ে এই শূন্যতা তৈরি হলো, যখন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে। তফসিল ঘোষণার আগেই বিএনপির অনেক প্রার্থী ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড ও প্রচারপত্র ছাপিয়েছেন, অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিজিটাল পোস্টারও ছড়িয়েছেন। এসব প্রচারসামগ্রীর বড় অংশেই রয়েছে খালেদা জিয়ার ছবি। কিন্তু তার মৃত্যুর পর বাস্তবতা পাল্টে গেছে।

সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা–২০২৫–এর বিধি ৭(চ) অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী দলীয় মনোনয়নে নির্বাচনে অংশ নিলে শুধু বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যানার, লিফলেট বা ফেস্টুনে ব্যবহার করতে পারবেন। ছবিটি পোর্ট্রেট আকারে হতে হবে এবং তা নেতৃত্বদান বা বিশেষ ভঙ্গিমায় ব্যবহার করা যাবে না। এই বিধির আলোকে বিএনপির প্রার্থীরা এখন দ্বিধায়—দলীয় প্রধান হিসেবে কাদের ছবি ব্যবহার করা যাবে।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও দলীয়ভাবে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। বাস্তবে এই পদবি ব্যবহারও করা হচ্ছে না। ফলে প্রচারে কার ছবি যাবে, তা নিয়ে এখনো মীমাংসা হয়নি।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলছেন, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও কৌশলগত বিবেচনায় বিষয়টি আপাতত সামনে আনা হচ্ছে না। তবে বাস্তবে সব সিদ্ধান্ত, দিকনির্দেশনা ও নির্বাচনী কৌশল নির্ধারিত হচ্ছে তারেক রহমানকে কেন্দ্র করেই। সময় হলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও আসবে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচনী পোস্টারে দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানতে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সে জন্য শিগগিরই কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় তিন দিনের শোক শেষে এখন বিএনপির সাত দিনের শোক কর্মসূচি চলছে, যা শেষ হবে ৫ জানুয়ারি। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে তার জন্য দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হচ্ছে। এই শোকের আবহেই দলকে এগোতে হচ্ছে নির্বাচনের প্রস্তুতির পথে।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমরা এখনো গভীর শোকের মধ্যে আছি। নির্বাচনী কাজে মন থেকে উৎসাহ হয় না। তবু যতটুকু করা সম্ভব, করতে হচ্ছে।’

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, শোক কর্মসূচি শেষ হলেই বিএনপি পূর্ণমাত্রায় নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করবে। অনেক নেতা-কর্মীর মতে, শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও খালেদা জিয়াই এবারের নির্বাচনী প্রচারের আবেগী কেন্দ্রে থাকবেন। তার জানাজা ও অন্তিম বিদায়ে মানুষের বিপুল উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক মহলের শ্রদ্ধাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার কৌশলেই এগোতে চায় দল। লক্ষ্য হচ্ছে—এই আবেগকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রেখে জনসমর্থনকে ভোটে রূপান্তর করা।

সে জন্য প্রতিটি আসনে প্রার্থীদের মাঠে সক্রিয় করা, স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা, জনসভা, উঠান বৈঠক ও ব্যক্তি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক উচ্চপর্যায়ের নেতা বলেন, ভোটের মাঠে দলের বার্তা হবে—খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তার আদর্শ, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব বিএনপির রাজনীতিতে জীবিত থাকবে।

ইতিমধ্যে নির্বাচন পরিচালনা ও কৌশল বাস্তবায়নের জন্য ৪১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রার্থী ব্যবস্থাপনা, বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ, সাংগঠনিক সমন্বয় ও প্রচারের দিকনির্দেশনা—সবকিছুই দেখবে এই কমিটি।

তবে নির্বাচনের পথে বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থীর বিষয়টি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শতাধিক আসনে একাধিক নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এরই মধ্যে রুমিন ফারহানা, সাইফুল আলম (নীরব), হাসান মামুনসহ নয়জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, আরও অনেককে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে বহিষ্কারের তালিকা বাড়বে।

বিএনপির নেতৃত্বের ভাষ্য, শরিকদের ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। তা না হলে সহানুভূতির রাজনীতি টিকবে না। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যারা মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন, তাদের ক্ষেত্রে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের সুযোগও রাখা হয়েছে।

দলের নেতারা মনে করছেন, খালেদা জিয়াকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা এখন বিএনপির ওপর আরও বেড়েছে। সে কারণে প্রতিটি ধাপে অত্যন্ত সতর্কভাবে এগোচ্ছে দল। সামনে রয়েছে মনোনয়ন বাছাই ও আপিল, প্রার্থিতা প্রত্যাহার, প্রতীক বরাদ্দ ও ইশতেহার চূড়ান্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। শীর্ষ নেতৃত্বের লক্ষ্য—কোনো পর্যায়েই ভোটারদের কাছে বিভ্রান্তিকর বা অপ্রত্যাশিত বার্তা না যাওয়া।

দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচনী প্রচারের শেষ ধাপে সরাসরি মাঠে নামবেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুকূলে থাকলে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দেশব্যাপী সফরের পরিকল্পনাও করতে পারেন।

Related Articles

Back to top button