২৫ জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নেই

অনলাইন ডেস্ক: তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এর আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের চিত্র। তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের অন্তত ২৫টি জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী রাখা হয়নি। আবার কিছু অঞ্চল তুলনামূলক কম আসন পেয়েও মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিএনপির ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটি নোয়াখালীর অনুপস্থিতি। অতীতে এই জেলা থেকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ–এর মতো প্রভাবশালী নেতা মন্ত্রিসভায় ছিলেন। কিন্তু এবার দলটি ওই অঞ্চলে ভালো ফল করলেও নোয়াখালী জেলা থেকে কাউকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়নি। যদিও বৃহত্তর নোয়াখালীর ফেনী ও লক্ষ্মীপুর থেকে দুজন পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন।
একইভাবে আওয়ামী লীগ–অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ থেকেও কেউ মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি, যদিও এবার প্রথমবারের মতো এই জেলা থেকে তিনজন বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান–এর জন্মস্থান এবং শেখ হাসিনা–র রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ জেলায় মন্ত্রী না থাকা অনেকের কাছে রাজনৈতিক ভারসাম্যের কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। মাদারীপুর ও শরীয়তপুরেও একই চিত্র দেখা গেছে—আসন জিতেও মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব নেই।
ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতেও একই প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ঢাকা জেলা থেকে একাধিক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও কেউ মন্ত্রী হননি। মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর—যেগুলো অতীতে বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এলাকা ছিল—সেখান থেকেও এবার কাউকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়নি। অথচ অতীতে মুন্সিগঞ্জ থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়া বদরুদ্দোজা চৌধুরী–সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন।
অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে আসনসংখ্যা তুলনামূলক কম পেলেও মন্ত্রিসভায় এই অঞ্চলের শক্ত উপস্থিতি দেখা গেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে রয়েছেন ঠাকুরগাঁও থেকে। দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও পঞ্চগড় থেকেও মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবদানের স্বীকৃতি।
রাজশাহী বিভাগ থেকেও একাধিক পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে বগুড়ার সন্তান হওয়ায় এই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এবং সিরাজগঞ্জের ইকবাল হাসান মাহমুদ–এর মতো অভিজ্ঞ নেতাদের মন্ত্রী করা হয়েছে।
কুমিল্লা এবার নির্বাচনে ভালো ফল করায় মন্ত্রিসভায় তার প্রতিফলন স্পষ্ট। এই জেলা থেকে তিনজন পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন। বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও প্রতিনিধিত্ব এসেছে। ফলে এটি নির্বাচনী ফলাফলের সরাসরি প্রতিফলন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাজনৈতিক পরিবার থেকে নতুন প্রজন্মের অন্তর্ভুক্তি। যশোর থেকে একমাত্র বিজয়ী অনিন্দ ইসলাম প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন, যাঁর বাবা তরিকুল ইসলাম অতীতে মন্ত্রী ছিলেন। একইভাবে ফরিদপুর থেকে প্রতিমন্ত্রী হওয়া শামা ওবায়েদ ইসলাম বিএনপির সাবেক নেতা কে এম ওবায়দুর রহমান–এর কন্যা। এটি দলীয় ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে জামায়াতের শক্তিশালী উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এলাকাগুলো থেকেও কেউ মন্ত্রী হননি। এতে জোটের ভেতরের সমীকরণ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। যদিও জোটের শরিকদের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য অন্যভাবে সমন্বয় করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে একজন পূর্ণমন্ত্রী ও কয়েকজন প্রতিমন্ত্রী থাকলেও আশপাশের জেলাগুলোর অনুপস্থিতি অনেকের কাছে বিস্ময়কর। বিশেষ করে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চল থেকে কেউ না থাকা অর্থনৈতিক প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নতুন মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রীরা মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন–এর কাছে শপথ নিয়েছেন। শপথের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্ন এখনই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
সব মিলিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা শুধু ক্ষমতার কাঠামো নয়, বরং নির্বাচনী ফলাফল, দলীয় অভিজ্ঞতা, পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ কৌশলের এক সমন্বিত প্রতিফলন। কোথাও পুরস্কার, কোথাও বার্তা, আবার কোথাও নতুন নেতৃত্বের উত্থান—এই তিন বাস্তবতার সমন্বয়েই গঠিত হয়েছে তারেক রহমানের প্রথম মন্ত্রিসভা।




