যশোরে লোডশেডিংয়ে ঘেরে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন

অনলাইন ডেস্ক: যশোরের শার্শায় মৎস্যঘেরে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। ঘের মালিকদের দাবি, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্র চালাতে না পারায় প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকার মাছ মারা গেছে। তবে এই দাবি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান জানান, বিদ্যুৎ বন্ধ থাকার কারণে মাছ মারা যাওয়ার অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

এর আগে গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে শার্শা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়পুর-সোনামুখো বিলের এ এফ মৎস্য খামারে মাছের মড়ক শুরু হয়। শনিবার সকালে ঘেরের পানিতে বিপুলসংখ্যক মৃত মাছ ভেসে উঠতে দেখা যায়।

ঘের মালিকদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘেরে প্যাডেল হুইল অ্যারেটরসহ অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্র চালানো সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া যোগ হওয়ায় পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। এতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মাছ মারা যায়।

সোনামুখো বিলের ক্ষতিগ্রস্ত ঘেরটির মালিক এ এফ মৎস্য খামার। আলফাজুল হক ও ফারুক হোসেন যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন।

ঘের মালিকদের দাবি, ২০০ বিঘা আয়তনের ওই ঘেরে প্রায় ৬০ লাখ পাবদা মাছ চাষ করা হয়েছিল। প্রতি ১৫টি পাবদা মাছের ওজন প্রায় এক কেজি ধরে মোট উৎপাদন প্রায় ১০ হাজার মণ। প্রতি মণ মাছের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫ হাজার টাকা হিসাবে শুধু পাবদা মাছের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা। অন্যান্য প্রজাতির মাছসহ মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকা বলে দাবি তাদের।

খামারমালিক আলফাজুল হক বলেন, ঘেরের মাছের বড় একটি অংশ বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছিল। মাছ মারা যাওয়ার আগের দিন কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টির পর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও পরে তীব্র গরম পড়ে। এরপর ঘন ঘন লোডশেডিং শুরু হয়। এতে মাছের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি হয়।

তবে ঘেরে নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকাও তাদের ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন তিনি। আলফাজুল হক বলেন, মাছের খাদ্য বাবদ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার মালামাল বাকিতে নেওয়া হয়েছিল। মাছ মারা যাওয়ায় সেই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

তবে লোডশেডিংয়ের কারণে মাছ মারা গেছে—এমন দাবি মানতে নারাজ যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান। তিনি বলেন, ঘেরে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো সম্পর্ক নেই। বিদ্যুৎ বন্ধ থাকার কারণে মাছ মারা যাওয়ার দাবি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ঘটনার দিন ওই এলাকায় ৪০ মিনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। একই বিতরণ লাইনের আওতায় আরও ১২টি মৎস্যঘের রয়েছে, সেগুলোতে কোনো সমস্যা হয়নি।

এদিকে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে জেলা প্রশাসনের গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিতে শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছাড়াও নাভারণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি), উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, ওজোপাডিকো-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা রয়েছেন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও মাছ মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, ওই এলাকায় ৪০ মিনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। ঘেরের পানির ঘনত্ব কম থাকলে ৪০ মিনিটেও মাছের মড়ক শুরু হতে পারে। তবে এত ব্যাপকভাবে মাছ মারা যাওয়ার কথা নয়। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

Related Articles

Back to top button