অগ্নিসংযোগের দুই বছর পরেও পুরোপুরি চালু হয়নি খুলনা বেতার

ভবনে এখনো পোড়ার ক্ষত; কয়লা আর ছাইয়ের স্তূপ
অনলাইন ডেস্ক: হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর দীর্ঘ প্রায় দুই বছর কেটে গেলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি খুলনা বেতার। ঢাকার কর্মসূচি সম্প্র্রচার ও নামমাত্র অনুষ্ঠান দিয়ে চলছে বেতার কেন্দ্রটি। ফলে বেকার অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে বেতার কেন্দ্রের দুই সহস্রাধিক শিল্পী ও কলাকুশলী। বেতার কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালুর দাবিতে ইতিমধ্যে শিল্পী ও কলাকুশলীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি দিলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে তারা হতাশ হয়ে পড়েছে। কবে নাগাদ বেতার কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হবে তা-ও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বেতার কেন্দ্র হচ্ছে খুলনা বেতার। মাত্র দুই বছর আগেও যেখানে থাকত সারাক্ষণ লোকের সমাগম ও বাদ্যযন্ত্রের ঝনঝনানি—সেখানে এখন সুনসান নীরবতা। হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের পর প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেলেও ভবনের মধ্যে এখনো রয়েছে পোড়ার সেই দগদগে ক্ষত; কয়লা আর ছাঁইয়ের স্তূপ। যেখানে নতুন করে বাসা বেঁধেছে মাকড়শা। সেভাবেই পড়ে আছে পুড়ে যাওয়া স্টুডিও ভবন, রেকর্ডিং কক্ষ, ট্রান্সমিশন কক্ষ, আর্কাইভ, এমসিআর কক্ষসহ সবকিছু। আর বাইরে যন্ত্রপাতির ধ্বংসাবশেষ। লুটপাট ও আগুনে পোড়ার পর কোটি কোটি টাকা দামের এ সব যন্ত্রপাতির সবই এখন বিকল। মানুষের পদচারণা না থাকায় বেতার ভবনের ভেতরে জন্মেছে আগাছা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয় খুলনা বেতার কেন্দ্রে। ঐ সময় লুটপাট করা হয় বেতার কেন্দ্রের কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এছাড়া, সেদিনের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় ৫৪ বছরের নথিপত্রসহ সংরক্ষিত অমূল্য সম্পদ। খুলনা বেতারের হিসেব মতে সেদিনের ঘটনায় ১০০ কোটি টাকার ওপরে ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই বছর। কিন্তু এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বেতার কেন্দ্রটি। বর্তমানে চারটি স্থানীয় সংবাদ, বিশেষ দিনের স্বল্প সময়ের অনুষ্ঠান ও দিনের বাদবাকি সময় ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্র্রচারের মধ্য দিয়ে চলছে কেন্দ্রটি। বেতার কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু না হওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেতারের সঙ্গে জড়িত ২ হাজার ৩০০ শিল্পী ও কলাকুশলী। যাদের মধ্যে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আবার অনেক শিল্পী বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন।
এদিকে, খুলনা বেতার পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য ইতিমধ্যে সংবাদ সম্মেলন করেছে খুলনা বেতার শিল্পী সারথির সদস্যরা। বেতার ভবনের সামনে পালন করা হয়েছে মানববন্ধন কর্মসূচি। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রী বরাবর দেওয়া হয়েছে স্মারকলিপি। যেখানে বলা হয়েছে নাটক, সংগীত, বাচিক ও যন্ত্রশিল্পী এবং সংবাদপাঠক, ঘোষক, অনুবাদকসহ ২ হাজার ৩০০ কলাকুশলী বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
খুলনা বেতারের অ্যানাউনসার তানিয়া সুলতানা বলেন, এক সময় একসঙ্গে কত শিল্পী-কলাকুশলী এই বেতার কেন্দ্রে কাটিয়েছি। কিন্তু ভাবতে পারি না গত দুই বছর ধরে বেতার কেন্দ্রটি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে আছে। এই বেতারের মাধ্যমে আমাদের সংসারটি কিছুটা হলেও চলত। কিন্তু গত দুই বছর আমরা খুবই দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছি। খুলনা বেতার শিল্পী সারথির সদস্যসচিব এস এম ইকবাল হাসান তুহিন বলেন, অবিলম্বে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র খুলনা বেতার কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুসহ শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট দরকার। শিল্পীরা দীর্ঘদিন বেকার অবস্থায় থেকে পরিবার-পরিজনসহ মানবেতর জীবনযাপন করছে।
খুলনা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, আমরা গত দুই বছর ধরে কোনো অডিশন নিতে পারি না। যারা শিল্পী আছেন তাদের অডিশন নিতে পারি না, যারা অ্যানাউনসমেন্ট করেন তাদের নিতে পারি না, নাটকে যারা আছেন তাদেরও নিতে পারি না। ফলে এসব লোকজন হতাশ হয়ে পড়ছে।
খুলনা বেতারের পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের হামলা ও অগ্নিকাণ্ডে মেশিন, যন্ত্রপাতিসহ ১০০ কোটি টাকার বেশি ভৌত অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। আমাদের শিল্পী-কলাকুশলী খাতের আগের সেই বরাদ্দ নেই।’ তিনি জানান, পুনরায় কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হলে সবকিছু ঢেলে সাজাতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ সব মিলিয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই শুরু হবে কাজ।
বাংলাদেশ বেতারের প্রধান প্রকৌশলী মুনীর আহমেদ বলেন, ‘খুলনা বেতারের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। স্টুডিও ব্লক। মূল ভবনটিকে অক্ষত রেখেই ৪০০ ফুট উচ্চতার টাওয়ার নির্মাণ করা হবে।’




