বিবিসির প্রতিবেদন

ইসরাইলে সবশেষ হামলা চালিয়ে আলোচনার টেবিলে শক্তিশালী ইরান
অনলাইন ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার আহ্বান উপেক্ষা করেই গত সপ্তাহান্তে ইরানে পালটা বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে ইরান আগের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছে। খবর বিবিসির।
রোববার (৭ জুন) লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরাইলি হামলার জবাবে ইসরাইল অভিমুখে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল তেহরান। এর জবাবে গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি বোমা বর্ষণ করল ইসরাইল। মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর ইরান যুদ্ধ শুরুর তিন মাস পরও এই অঞ্চলের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যকে কতটা বিপজ্জনক করে তুলেছে, এই সংঘাত তারই প্রমাণ।
বর্তমান পরিস্থিতি মূলত তিনটি বিষয়কে সামনে এনেছে—
ট্রাম্পের সীমাবদ্ধতা: ট্রাম্প প্রকাশ্যে তার ইসরাইলি মিত্রকে যতটা নিয়ন্ত্রণের দাবি করেন, বাস্তবে তিনি তা পারছেন না। তেহরানও ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এ দূরত্বকে কাজে লাগাতে চাইছে।
ইরানের নতুন কৌশল: লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি হামলার জবাব দিতে ইরান এখন নিজের ভূখণ্ডে পালটা হামলার ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। এর মাধ্যমে তারা চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ভাগ্যকে ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সংকটের সঙ্গে জুড়ে দিতে চায়।
পরমাণু চুক্তিতে বিলম্ব: ট্রাম্পের বহুল আকাঙ্ক্ষিত পরমাণু চুক্তি এখনই হচ্ছে না। ইরান বুঝতে পেরেছে যে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ট্রাম্প নতুন কোনো যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে নিজেদের দাবি আদায়ের চেষ্টা বাড়িয়েছে তেহরান।
হামলা থামলেও সতর্ক অবস্থানে দুই পক্ষ
রোববার ইসরাইলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরপরই ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি নেতানিয়াহুকে ফোন করে পালটা হামলা না চালানোর নির্দেশ দেবেন। কারণ ট্রাম্পের ভয় ছিল, ইসরাইলের পালটা জবাব তেহরানের সঙ্গে তার ভঙ্গুর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ভেস্তে দিতে পারে।
কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানে হামলা চালায় ইসরাইল। সোমবার বিকালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে যখন তার কথা হচ্ছিল, ততক্ষণে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো আকাশে উড়াল দিয়ে দিয়েছিল। তবে নেতানিয়াহু তার নির্দেশ অমান্য করেছেন—এমন দাবি অস্বীকার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, আমি তাকে কিছু করতে বললে সে তা শোনে।
মুখে ট্রাম্প যাই বলুন না কেন, দৃশ্যত তিনি নেতানিয়াহুকে থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদিও মঙ্গলবার (৯ জুন) ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমরা একটি খুব ভালো চুক্তির একেবারে শেষ পর্যায়ে আছি। দুই-তিন দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হতে পারে।
সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে বৈরুতে হামলা চালানোর জেদ করায় নেতানিয়াহুর ওপর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। নেতানিয়াহুকে তিনি ‘পাগল’ বলেও আখ্যা দেন। ট্রাম্পের আশঙ্কা ছিল, নেতানিয়াহুর এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে তার চুক্তি করার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
নেতানিয়াহু কি আসলেই ট্রাম্পকে অমান্য করেছেন?
আপাতদৃষ্টিতে তা মনে হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তরটি সম্ভবত ‘না’। ইসরাইলের এই হামলার পেছনে ওয়াশিংটনের সীমিত বা পরোক্ষ সম্মতি ছিল। প্রবীণ মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্প মূলত নেতানিয়াহুকে একটি ‘হলুদ বাতি’ দেখিয়েছিলেন।
পেন্টাগনের সেন্ট্রাল কমান্ডের সাহায্য এবং আকাশপথের সমন্বয় ছাড়া ইসরাইলের পক্ষে ইরানে এ হামলা চালানো কার্যত অসম্ভব ছিল।
সোমবার বিকালের মধ্যে ইসরাইল ও ইরান—উভয় পক্ষই এই দফার হামলা-পালটা হামলা শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ট্রাম্পও পরিস্থিতি এখানেই শান্ত রাখতে চান। রোববার রাতে ট্রাম্পের ‘নেতানিয়াহুকে থামানোর’ বার্তাটি হয়তো তেহরানকে শান্ত রাখার একটি কৌশল ছিল, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই হামলা থেকে দূরে রাখা যায়।
সুবিধাজনক অবস্থানে ইরান
ইরানের জন্য এই হামলা ছিল একটি বড় পরীক্ষা। এই প্রথম ইরান সরাসরি নিজের ওপর হামলার কারণে নয়, বরং লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসনের জবাবে ইসরাইলের মূল ভূখণ্ডে আঘাত করল। ইরান দেখতে চেয়েছিল, ইসরাইলের পালটা হামলায় মার্কিনিরা কতটা সমর্থন দেয় বা নিজেরা সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় কিনা।
সংঘাত শেষে ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনার ওপরই জোর দিচ্ছে। রোববার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সাথে চুক্তি খুব কাছাকাছি। হামলার পর তিনি বিষয়টিকে হালকা করে বলেন, দুপক্ষই ‘নিজেদের শখ মিটিয়ে নিয়েছে’, এবার আলোচনার সময়।
এই পরিস্থিতির পর ইরানি নেতৃত্ব আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মন্তব্য করেছেন, এই সামরিক প্রতিরোধ আমেরিকার সাথে আলোচনার টেবিলে তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, আমরা যুদ্ধক্ষেত্রও ছাড়িনি, আলোচনার টেবিলও ত্যাগ করিনি।
বর্তমানে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরান আলোচনার টেবিলে প্রধানত দুটি জিনিস চায়—প্রথমত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তাদের আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের তেলের রাজস্ব ফেরত পাওয়া; এবং দ্বিতীয়ত, লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি হামলা সীমিত করা।
সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে মার্কিন অর্থনীতি চাপে রয়েছে। তেহরান স্পষ্ট বুঝতে পারছে, ট্রাম্প এখন যুদ্ধের চেয়ে চুক্তি করতেই বেশি আগ্রহী। তবে ট্রাম্প এখনই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বা অর্থ ছাড়ের দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। আর এই কারণেই চুক্তিটি এখনো ঝুলে রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।



