হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের যৌথ পরিকল্পনায় বিপাকে ওমান

অনলাইন ডেস্ক: কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এবং এই পথ দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর বিশেষ কর বা ফি বসানোর বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে—ইরানের পক্ষ থেকে এমন তথ্য ফাঁসের পর তীব্র ভূরাজনৈতিক চাপে পড়েছে মাসকাট।
এই বিরোধপূর্ণ জলপথের দক্ষিণ তীরে ওমানের মুসান্দাম ছিটমহল অবস্থিত, যা বৈশ্বিক সামুদ্রিক জ্বালানি তেল পরিবহনের এক-পঞ্চমাংশের নিয়ন্ত্রক। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে দীর্ঘ ১০ সপ্তাহ ধরে এই আন্তর্জাতিক রুটটি অবরুদ্ধ রয়েছে। ওমানের নীরবতার সুযোগে ইরানের এই একক পরিকল্পনার পর পশ্চিমা দেশগুলো ওমানের ওপর চাপ বাড়াতে শুরু করেছে।
শুক্রবার (১৫ মে) ভারতের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণভাবে ওমান ও ইরানের নিজস্ব জলপথ বলে দাবি করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রণালিটি দুই দেশের জলসীমার মধ্যে অবস্থিত এবং এর মাঝে কোনো আন্তর্জাতিক জলসীমা নেই।
আরাগচি আরও জানান, প্রণালিটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান ও ওমান যৌথভাবে একটি রূপরেখা তৈরি করছে। তবে এই জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর ফি আদায় এবং সব জাহাজের মালিকানা সংক্রান্ত গোপন তথ্য চাওয়ার বিষয়ে ইরানের পরিকল্পনার ব্যাপারে ওমান সরকার এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ রয়েছে।

পশ্চিমা কূটনীতিকেরা ইরানের এই নতুন প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ইরান কোন দেশের মালিকানায় জাহাজ চলছে তার ওপর ভিত্তি করে ইচ্ছেমতো জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বা আটকে দেওয়ার একচেটিয়া ক্ষমতা পাবে। তা ছাড়া সেবা মূল্য পরিশোধের জন্য প্রতিটি জাহাজকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালে একটি বিশেষ অ্যাকাউন্ট খোলার শর্ত দেওয়া হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সরাসরি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার পরিপন্থী হবে, কারণ এই প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ সরাসরি বিতর্কিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কাছে চলে যাবে যা আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ।
ইরানের এই একপেশে পদক্ষেপের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য একটি যৌথ বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করে ওমানের কাছে হস্তান্তর করেছে, যাতে উপসাগরীয় অধিকাংশ দেশেরই সমর্থন রয়েছে।
এই বিষয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক পরিচালক লর্ড লুয়েলিনসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডমিনগুয়েজ সম্প্রতি ওমানের রাজধানী মাসকাট সফর করেছেন। বর্তমানে উপকূলীয় দেশগুলোর এই ধরনের আন্তর্জাতিক জলপথে টোল আদায়ের কোনো আইনি অধিকার আছে কি না, সেটাই এখন এই প্রণালিটি পুনরায় চালুর প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান ১৯৮২ সালে জাতিসংঘের সামুদ্রিক আইনবিষয়ক সনদে (আনক্লস) স্বাক্ষর করলেও তা কখনো দেশের সংসদে অনুমোদন বা র্যাটিফাই করেনি। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, তারা এই চুক্তির নিয়ম মানতে বাধ্য নয় এবং এর বদলে তারা প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে চায়।
ইরান আরও মনে করে, উপকূলীয় কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কোনো সামরিক হুমকি এলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত করার বৈধ অধিকার তাদের রয়েছে। সংঘাতের শুরুতেই তেহরান অভিযোগ করেছিল যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর হামলার জন্য সেখানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মজুত করেছে।
এই সংকটের মধ্যেই গত ৫ মে ইরান ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি (পিজিএসএ)’ নামে একটি বিশেষ সরকারি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, যার মাধ্যমে তারা এই রুটকে একটি লাভজনক মাধ্যমে পরিণত করতে চায়।

পিজিএসএ জানিয়েছে, এখন থেকে প্রণালিটি পার হওয়ার অনুমতি ও চলাচলের রুট ম্যাপ পেতে জাহাজগুলোকে ই–মেইলের মাধ্যমে তাদের অফিসে অগ্রিম নিবন্ধন করতে হবে এবং প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য আনুমানিক এক ডলার সমপরিমাণ ফি ইরানি রিয়ালে পরিশোধ করতে হবে। তবে বেইজিংয়ে এক শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একমত যে হরমুজে কোনো ধরনের টোল বা নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে না। যদিও চীনের আমদানিকৃত ইরানি তেলের প্রায় ৪৫ শতাংশই এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা শুধু এই দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের দ্রুত অবসান চায় এবং এই পথটি বন্ধ হওয়ার মূল কারণ হলো ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ। আইআরজিসি গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ইরানে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সফল আলোচনার পর তেহরান বেশ কিছু চীনা তেলের ট্যাংকারকে প্রণালি পার হওয়ার বিশেষ অনুমতি দিচ্ছে, কারণ এসব জাহাজ ইরানের নতুন নিয়মকানুন মেনে চলতে রাজি হয়েছে। তবে চীন কোনো ফি দিয়েছে কি না তা স্পষ্ট করা হয়নি।
এর বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, যারা এই বেআইনি টোল বা ফি দেবে, তারা গভীর সমুদ্রে মার্কিন নৌবাহিনীর কারণে নিরাপদে চলাচল করতে পারবে না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান




