এক মসজিদে ৭২ বছর ইমামতি, অবশেষে মুসল্লিদের অশ্রুসিক্ত বিদায়

অনলাইন ডেস্ক: গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্মকে স্পর্শ করা দীর্ঘ দিনের অধ্যায় আজ আবেগঘনভাবে সমাপ্তি হলো। টানা ৭২ বছর খতিব ও ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আলহাজ্ব মাওলানা আবদুল হক পীর সাহেব শুক্রবার (২ ডিসেম্বর) জুমার নামাজের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন। মুসল্লিরা শেষ খুতবা শোনার সময় আবেগের অশ্রু ঝরালেও তার দীর্ঘ সেবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেন।
মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা যায়, আলহাজ্ব মাওলানা আবদুল হক হুজুর ১৯৫৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর মাত্র ১৩ বছর বয়সে গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ইমামতি শুরু করেন। সে সময় তিনি সোনাকান্দা দারুল হুদা মাদরাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। ছোট বয়সে শুরু হওয়া এই যাত্রা পরিণত হলো সাত দশকেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ, নিষ্ঠাবান সেবায়। ৭২ বছর ১ দিন ধরে মসজিদে তার উপস্থিতি মুসল্লিদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল।
বর্তমানে আলহাজ্ব মাওলানা আবদুল হক পীর সাহেবের বয়স ৮৭ বছর ২ মাস। খতিবের দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়া সত্ত্বেও তিনি মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবেন। জানা গেছে, তিনি জীবদ্দশায় নিয়মিত জুমার নামাজে অংশগ্রহণ করবেন এবং রমজান মাসে ইতেকাফ পালন করবেন। মসজিদ কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আলহাজ্ব মাওলানা আবদুল হক হুজুরের ছেলে আব্দুল কাদিরকে নতুন ইমাম হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কাদির জানান, তার বাবা সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে মসজিদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাই বিদায় সহজ ছিল না।
মসজিদ কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান আবেগভরে বলেন, ‘হুজুর মাত্র ১৩ বছর বয়সে এখানে ইমামতি শুরু করেছিলেন। আজকের দিনে এমন নিখুঁত ও নিষ্ঠাবান ইমাম পাওয়া হয়তো আর সম্ভব নয়। এখানে টাকার বিনিময় কোনো বিষয় ছিল না। তার দাদা, বাবা ও চাচা এই মসজিদে ইমামতি করেছেন, আর হুজুর দীর্ঘদিন ধরে এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। ৭২ বছর ধরে মুসল্লিরা তার পেছনে নামাজ আদায় করেছেন। এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘হুজুরের মেধা, প্রজ্ঞা ও নৈতিক গুণাবলী বর্ণনার বাইরে। আমরা তার অভাব গভীরভাবে অনুভব করব। আমরা সবাই চাই তিনি আরও ইমামতি চালিয়ে যান। কিন্তু বয়সের কারণে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমাদের জন্য এটি খুবই মর্মাহত করার মতো ঘটনা।’
মসজিদের মুসল্লিরা বলছেন, আলহাজ্ব মাওলানা আবদুল হক পীর সাহেবের নাম স্মৃতি থাকবে দোয়া ও ভালোবাসায়। তার খুতবা, নীতি, প্রজ্ঞা এবং নিষ্ঠা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
তারা আরও জানায়, এক মসজিদ, কয়েক প্রজন্মের মুসল্লি এবং একক কণ্ঠের খুতবার ৭২ বছরের যাত্রা- এই তিনটি সংমিশ্রণে গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইতিহাস আজ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আলহাজ্ব মাওলানা আবদুল হক পীর সাহেবের সেবা, অবদান এবং প্রজ্ঞা ভবিষ্যতের মুসল্লিদের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে।



